হামের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক: বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এমন তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

বুধবারের (৯ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে হাম-সংশ্লিষ্ট ৯৯৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

তবে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে হামের উপসর্গে মারা গেছে ৯০২ জন এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ শিশু। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে তিনজনের মৃত্যু হলেও নিশ্চিত হামে নতুন কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে রয়টার্স বলছে, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর মধ্যে ১০০টি নিশ্চিত বলে জানানো হয়েছে। এ সময়ে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হলেও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪-২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা না পাওয়া শিশু এবং টিকা সরবরাহের সমস্যার কারণে বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বয়সী শিশুরা নিয়মিত হাম টিকার জন্য এখনো উপযুক্ত নয়। ফলে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার সংসদে জানিয়েছেন, টিকা কেনার নীতিতে পরিবর্তনের কারণে সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান বাতিল হওয়ায় আরও অনেক শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাতের বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় দেশের হাসপাতালগুলোও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার একদিনে ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তির খবর পাওয়া গেছে, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা।

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালটিতে হামের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

১ হাজার ৩৫০ রোগীর জন্য নির্মিত হাসপাতালটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি। হাম রোগীদের উপসর্গ উপশমে ব্যবহৃত শিশুদের স্যালাইনের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান আরও শক্তিশালী করা এবং যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে তাদের জন্য ক্যাচ-আপ কর্মসূচি চালানো জরুরি।

এপিডেমিওলজিস্ট ও সাবেক আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪-২৫ সালের টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তার মতে, টিকাদানের আওতা বাড়ানো, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলেও দুই ডোজ টিকার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের চাপ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। -সূত্র: রয়টার্স

—জা.অর্থনীতি/আরএস