কৃষিতে সংকট বনাম সিন্ডিকেট

নাসির বাবু: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতির প্রধান বুনিয়াদ কৃষি। আমাদের দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ১২ শতাংশই আসে কৃষি থেকে। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। গবেষণা তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মাটি চাষাবাদ এর জন্য খুবই উপযোগী। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের কৃষিজ উৎপাদন প্রায় ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে তথ্য প্রযুক্তির এ আধুনিক যুগে কৃষি খাত একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে গড়ে উঠবে। অথচ বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা বরাবরই প্রতারিত হচ্ছেন। 

কৃষক দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও বরাবরই উপেক্ষিত। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ধানের ন্যায্যমূল্য মিলছে না। শ্রমিক সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, বীজের উচ্চমূল্য, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সার-কীটনাশকের কৃত্রিম সংকট কৃষকের উৎপাদনকে কঠিন করে তুলছে। সরকারি মূল্যে সার না পেয়ে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে কৃষককে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার কৃষকদের বিনামূল্যে সার, বীজ সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায় মৌসুমের মাঝামাঝি অথবা শেষের দিকে এই সার এবং বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছায়। ততক্ষণে কৃষক হয়তো ধার-দেনা করে জমি চাষ করে ফেলেছে। যদি কাঙ্ক্ষিত সময়ে সার এবং বীজ সরবরাহ করাও হয় মূলত যারা কৃষক তারা এর সুফল খুব কমই পায়। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের বঞ্চিত করা হয়। সরকারিভাবে যত টাকার সার, বীজ প্রণোদনা দেওয়া হয় তা উঠাতে কৃষককে সারাদিন কৃষি অফিসেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে সারা দিনের পরিশ্রমের টাকায় হয়তো সমমূল্যের সার বীজ কেনার উপক্রম হয়। এতে সরকারি প্রণোদনার প্রতি কৃষকদের কিছুটা অনিহা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রণোদনা পেতে ক্ষেত্র বিশেষে রাস্তার ধারে জমি দেখানো বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। এতে কিছুটা লোক দেখানো সহায়তার বহিঃপ্রকাশ পায়। ফলে প্রশ্ন থেকে যায় প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা সত্যিকার অর্থেই সহায়তা পাচ্ছে কি না?

মাঝেমধ্যে সরকার কৃষি পণ্যের নির্ধারিত বাজার মূল্য ধার্য করলেও মাঠপর্যায়ের তার বাস্তবায়ন না থাকায় এর সুফল ভোগ করে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। এভাবে সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষক ও কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আসছে। বর্তমানে দেশে শিক্ষিত তরুণদের ৩৬ শতাংশই বেকার। কৃষি খাতের এ বিরূপ পরিস্থিতিতে দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণরা কৃষি থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশে বেকারত্বের হার আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে এ দেশ কৃষিতে সম্পূর্ণরূপে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে। অথচ যথাযথ সরকারি নজরদারি থাকলে সার বা কৃষি সংশ্লিষ্ট পণ্য স্বল্প মূল্যে আমদানি ও যথাযথ বাজার তদারকির মাধ্যমে কৃষিতে উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। এতে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ব্যয় কমে আসলে বাজারে তার প্রভাব স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে। কৃষি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যের দামও কমে আসবে। এতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা হলেও কমানো যাবে।

তাছাড়া ফসল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় প্রতিবছর প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। বিশেষ করে আলু ও পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাবেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলে দেশীয় বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। দেশেই পর্যাপ্ত হিমাগার ও ফসল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কৃষক উপকৃত হবে। পাশাপাশি কৃষিতে স্বল্প সুদে ঋণ ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ালে তরুণরা এ পেশায় আকৃষ্ট হবে। ফলে বেকারত্বের হার কিছুটা হলেও কমবে। সর্বোপরি সব ধরনের সিন্ডিকেট ভেঙে কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমালে, কৃষি একটি সম্মান ও লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে উঠবে। দেশের কৃষিজ পণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমান সরকারের উচিত ‘কৃষক বাঁচলে, বাঁচবে দেশ’ এই মূল প্রতিপাদ্য কে সামনে রেখে কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতিতে জোর দেওয়ার পাশাপশি কৃষিতে ভর্তুকি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়