ফজলুর রহমান রনি, ঢাকা: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কোয়ালিটি অব সার্ভিস যাচাই-বাছাইয়ে মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেডের জমা দেওয়া তথ্যে অসংগতি, ভুল তথ্য ও কারচুপির চিত্র উঠে এসেছে। নেটওয়ার্কের প্রকৃত মান যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পর্যায়ের ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের ‘কাঁচা তথ্য’ বা ‘র ডেটা’ না দিয়ে নিজেদের তৈরি প্রক্রিয়াজাত সার-সংক্ষেপ প্রতিবেদন (সামারি রিপোর্ট) জমা দিয়েছে অপারেটরটি। সম্প্রতি প্রকাশিত জুলাই ২০২৪-এর পারফরম্যান্স রিকনসিলিয়েশন রিপোর্টে রবির নেটওয়ার্ক মানের বিচ্যুতি, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিমাপের সঙ্গে জমা দেওয়া তথ্যের পার্থক্য উন্মোচিত হয়েছে।
বিটিআরসির সূত্রে জানা যায়, সেবা প্রদানকারী অপারেটরগুলো বাস্তবে কেমন পারফর্ম করছে তা সঠিকভাবে পর্যালোচনার জন্য ‘র ডেটা’ বিশ্লেষণ করা বাধ্যতামূলক। তবে রবি ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের ‘র ডেটা’ না দিয়ে কেবল প্রক্রিয়াজাত সামারি রিপোর্ট দাখিল করায় নেটওয়ার্কের প্রকৃত পারফরম্যান্স ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটির পুরো চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে বিটিআরসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিটিআরসির নিজস্ব নিরীক্ষার সঙ্গে রবির জমা দেওয়া তথ্যের মধ্যে জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত প্রায় প্রতিটি সূচকে অমিল পাওয়া গেছে। জাতীয় পর্যায়ে টুজি কল ড্রপ রেট বিটিআরসির মনিটরিংয়ে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ২৪০৫ শতাংশ, যেখানে রবি নিজেদের রিপোর্টে তা কম দেখিয়ে শূন্য দশমিক ২১৭৪ শতাংশ দাবি করেছিল। ফোরজি গড় ডাউনলোড স্পিডে বিটিআরসির মনিটরিংয়ে গতি পাওয়া গেছে ৬ দশমিক ৮৪৭৭ এমবিপিএস যা রবির দেওয়া তথ্যে বাড়িয়ে ৭ দশমিক শূন্য ৫৪৪ এমবিপিএস দেখানো হয়েছিল।
টুজি কল সেটআপ সাকসেস রেট বিটিআরসির মাপে ছিল ৯৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কিন্তু রবি তাদের রিপোর্টে এটি দেখায় ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ফোরজি এলটিই ই-আরএবি নন-রিটেইনেবিলিটি বিটিআরসির হিসাবে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ আসলেও রবির দাখিল করা তথ্যে তা ছিল শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ। ফোরজি আরআরসি সাকসেস রেট বিটিআরসির পরিমাপে ৯৯ দশমিক ৮১ শতাংশ পাওয়া গেলেও রবির দাবি ছিল ৯৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
ফোরজি ভিওএলটিই কল সেটআপ সাকসেস রেট বিটিআরসির হিসাবে ৯৮ দশমিক ৯১ শতাংশ হলেও রবি দাবি করেছিল ৯৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। ভিওএলটিই ড্রপ বা অ্যাবনরমাল রিলিজ রেট বিটিআরসির পরিমাপে শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ হলেও রবি রিপোর্টে তা দেখায় শূন্য দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ভিওএলটিই+জিএসএম সমন্বিত অ্যাবনরমাল রিলিজ রেট বিটিআরসির হিসাবে শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ হলেও রবির তথ্যে ছিল শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ।
ভিওএলটিই+জিএসএম কম্বাইন্ড ভয়েস সেটআপ সাকসেস রেট বিটিআরসির হিসাবে ৯৯ দশমিক ৫২ শতাংশ আসলেও রবি দাবি করে ৯৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সিএসএফবি সাকসেস রেট বিটিআরসির মনিটর করা মান অনুযায়ী ৯৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ হলেও রবির জমা দেওয়া রিপোর্টে তা ছিল ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এসএমএস কমপ্লিশন রেট বিটিআরসির রেকর্ডে ৯৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ হলেও রবির দাবি অনুযায়ী তা ছিল ৯৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
টুজি কল সেটআপে ব্যর্থতা ও পার্বত্য অঞ্চলে নেটওয়ার্কে ধস
জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী কল সেটআপ সাকসেস রেট ন্যূনতম ৯৯ শতাংশ হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রবি ব্যাপক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে তিনটি জেলায় রবি এই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে (উত্তীর্ণ ৬১/৬৪)। উপজেলা পর্যায়ে দেশের ৫৪৪টি উপজেলার মধ্যে ২৪টি উপজেলায় রবি নির্ধারিত মানদণ্ড স্পর্শ করতে পারেনি (উত্তীর্ণ ৫২০/৫৪৪)।
বিশেষ করে পার্বত্যাঞ্চল বান্দরবান জেলায় রবির সেবার মান আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বান্দরবানের উপজেলাগুলোয় টুজি কল সেটআপ সাকসেস রেট জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়। এর মধ্যে থানচি উপজেলায় টুজি কল সেটআপ সফলতা ৯০ দশমিক ৬০ শতাংশ, রুমাতে ৯১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, রোয়াংছড়িতে ৯৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৯৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
ভয়েস কল সেটআপের ক্ষেত্রেও বান্দরবানে বিপর্যয় দেখা গেছে। থানচি উপজেলায় ভয়েস কল সংযোগের সফলতা ছিল মাত্র ৯৪ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং রুমাতে ৯৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ যা বিটিআরসির নির্ধারিত ৯৯ শতাংশ মানদণ্ডের অনেক নিচে। এছাড়া বান্দরবান জেলায় টুজি কল ড্রপ রেট বিটিআরসির মনিটরিংয়ে শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ পাওয়া গেলেও রবি নিজেদের দাখিল করা রিপোর্টে তা শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ বানিয়ে দেখিয়েছিল।
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন দুর্গম উপজেলায়ও সেবার মানদণ্ড পূরণে চরম ব্যর্থতা দেখা গেছে। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় ভয়েস কল সংযোগ সফলতা ৯৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া লক্ষ্মীছড়িতে ৯৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, মহালছড়িতে ৯৭ দশমিক ১৫ শতাংশ, মানিকছড়িতে ৯৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ, পানছড়িতে ৯৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং রামগড়ে ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ সফলতা পাওয়া গেছে যা বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ডের নিচে।
একইভাবে রাঙামাটি জেলার লংগদু ও নানিয়ারচর উপজেলায় ভয়েস কল সংযোগের সফলতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যথাক্রমে ৯৪ দশমিক ৪১ শতাংশ ও ৯৪ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে গেছে। এছাড়া বাঘাইছড়িতে ৯৭ দশমিক ৮১ শতাংশ, বরকলে ৯৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ, বিলাইছড়িতে ৯৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং কাউখালীতে (বেতবুনিয়া) ৯৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ সংযোগ সফলতা ধরা পড়েছে।
যদিও ফোরজি ডাউনলোড স্পিডে জাতীয়ভাবে রবি উত্তীর্ণ (৩ দশমিক ৫০ এমবিপিএস মানদণ্ডের বিপরীতে জাতীয় গড় ৬ দশমিক ৮৪৭৭ এমবিপিএস), তবে আঞ্চলিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। ঢাকা শহরের বড় এলাকায় ইন্টারনেট স্পিড ১৫ থেকে ২০ এমবিপিএস পর্যন্ত থাকলেও বহু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গতি কমে ২ থেকে ৩ এমবিপিএসের ঘরে নেমে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাগেরহাটের চিতলমারী ও মোংলা উপজেলায় ফোরজি ডাউনলোড স্পিড নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৬৯ এমবিপিএসে।
জেলা পর্যায়ে স্পিডের তথ্যেও হেরফের করেছে অপারেটরটি। বাগেরহাট জেলায় ফোরজি স্পিড বিটিআরসির মনিটরিংয়ে গড়ে ৩ দশমিক ৪১ এমবিপিএস পাওয়া গেলেও রবি তাদের রিপোর্টে তা ৪ দশমিক শূন্য ৬ এমবিপিএস হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
এমনকি উপজেলাভিত্তিক কমপ্লায়েন্স গণনেও রবি অসামঞ্জস্য প্রকাশ করেছে। উপজেলা পর্যায়ে ভিওএলটিই+জিএসএম ভয়েস সেটআপ সাকসেস রেটের ক্ষেত্রে বিটিআরসির মনিটরিং অনুযায়ী দেশের ৫৩৮টি উপজেলা মানদণ্ড পূরণ করেছে (অনুত্তীর্ণ ৬টি)। কিন্তু রবি নিজেদের দাখিল করা রিপোর্টে উল্টো মাত্র ৫৩৩টি উপজেলা উত্তীর্ণ হয়েছে বলে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাব দিয়েছিল (রবির তথ্যে অনুত্তীর্ণ ১১টি)।
বিটিআরসি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, অতীতে অপারেটরদের জমা দেওয়া জাতীয় পর্যায়ের প্রক্রিয়াজাত রিপোর্টগুলো সরাসরি গ্রহণ করা হতো এবং সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই বা রিকনসাইল করা হতো না। এবারই প্রথম স্বাধীন পর্যালোচনার মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা-ভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ পারফরম্যান্স তথ্য বের করা হয়েছে।
কমিশন রিপোর্টে জানায়, এই রিপোর্ট প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য হলো সারা দেশের দুর্বল নেটওয়ার্ক এলাকাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা, ওই এলাকাগুলোতে টার্গেটেড ড্রাইভ টেস্ট পরিচালনা করা এবং গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করতে অপারেটরগুলোকে কার্যকর ও জবাবদিহিতামূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবির জনসংযোগ অফিস জাতীয় অর্থনীতিকে জানায়, টিএমএস ডেটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। এই ডেটা কেবল একটি নির্দিষ্ট মনিটরিং পদ্ধতির ফলাফল যা অপারেটরের সামগ্রিক নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্স বা বিস্তৃত কভারেজের সব অঞ্চল ও গ্রাহক অভিজ্ঞতার চিত্র প্রতিফলিত নাও করতে পারে। নির্ধারিত সময়ে ডেটা পাওয়া না গেলে তা পরবর্তীকালে উদ্ধারের দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার আলোকে দেখা প্রয়োজন। ফলে শুধু টিএমএস ডেটার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়নের বদলে কভারেজ, কল ড্রপ, ডেটা স্পিড ও নেটওয়ার্ক অ্যাভেইলেবিলিটিসহ অন্যান্য সূচক বিবেচনা করে একটি ন্যায্য ও কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন করার দাবি জানায় অপারেটরটি।
রবির র ডেটা না দেওয়া এবং সেবার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা সত্ত্বেও কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া প্রসঙ্গে বিটিআরসি জাতীয় অর্থনীতিকে জানায়, কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) মূল্যায়নে বিপুল পরিমাণ (হাইভলিউম) নেটওয়ার্ক ‘র’ বা বাইনারি ডেটা ব্যবহৃত হয়। তবে রবির কারিগরি ও স্টোরেজ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে তারা ডেটা তৈরির পর মাত্র সাত দিন পর্যন্ত তা সংরক্ষণ করতে পারে। বিটিআরসি ও রবির মধ্যে সংযোগ সক্ষমতার এই সীমাবদ্ধতা এবং নতুন রিপোর্টিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই কমিশন প্রক্রিয়াজাত ডেটা ব্যবহার করেছে। পরবর্তীকালে কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সব ডেটা সিস্টেমের আওতায় আনা হবে।
এছাড়া নির্ধারিত তিনটি জেলা ও ২৪টি উপজেলায় রবির সেবার মান নিশ্চিত করতে না পারা প্রসঙ্গে বিটিআরসি জানায়, বিষয়টিতে কমিশন অবগত রয়েছে এবং রবি বর্তমানে তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা উন্নীতকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আইন ও লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিতে এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে চলমান রয়েছে।