নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরও আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি আইএফআইসি ব্যাংক। বরং লোকসান, খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার ৬৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটিও ঋণাত্মক হয়ে গেছে।
এই আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে পরিচালকদের অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণ, দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে। কয়েকটি বিতর্কিত ঋণের অনিয়ম তদন্ত এবং কর্মকর্তা নিয়োগের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্যও পরিচালকেরা সম্মানী নিয়েছেন বলে পরিদর্শনে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৯ মাসে লোকসান বেড়েছে ৭০১ কোটি টাকা
আইএফআইসি ব্যাংকের ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ১ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে লোকসান বেড়েছে ৭০১ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৯ শতাংশ।
শুধু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ৮৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। গত বছরের একই প্রান্তিকে লোকসান ছিল ৬৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
লোকসানের প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়েও। প্রথম ৯ মাসে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৩ টাকা ৪ পয়সা। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪ টাকা ৩৬ পয়সা। গত বছরের একই প্রান্তিকে তা ছিল ৩ টাকা ৫৩ পয়সা।
আয় কমলেও ব্যয় বেড়েছে
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে সমন্বিত হিসাবে ব্যাংকটির মোট সুদ ও বিনিয়োগ আয় হয়েছে ১ হাজার ১২২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১ হাজার ৬৬২ কোটি ৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ৫৩৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
সুদ বাবদ ব্যয় মেটানোর পর নিট সুদ ও বিনিয়োগ আয় ঋণাত্মক হয়েছে ২ হাজার ২৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে তা ঋণাত্মক ছিল ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ঘাটতি বেড়েছে ৬৭২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ব্যাংকটির সমন্বিত পরিচালন আয়ও ঋণাত্মক। প্রথম ৯ মাসে তা দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ হাজার ৫৯৩ কোটি ১৩ লাখ টাকায়। গত বছরের একই সময়ে ছিল ঋণাত্মক ৯০৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে পরিচালন আয়ের ঘাটতি বেড়েছে ৬৮৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
আয় কমলেও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এই ব্যয় হয়েছে ৯০২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮৮৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ব্যয় বেড়েছে ১৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
পুনঃতফসিলের পরও বাড়ছে খেলাপি ঋণ
ব্যাংকটির সংকটের বড় একটি দিক খেলাপি ঋণের উচ্চহার। ২০২৪ সালের শেষে একক হিসাবে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা কমে হয় ৫৩ দশমিক ১২ শতাংশ। তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
তবে এই উন্নতি স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই খেলাপি।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতিও রাখতে পারেনি ব্যাংকটি। জুন শেষে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৪৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। সংরক্ষণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ১৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
একই সময়ে ঋণের বিপরীতে আদায় স্থগিত থাকা সুদের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ৪০০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। বিপুল খেলাপি ঋণের পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
ঋণাত্মক শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি
আইএফআইসির মূলধন পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। ২০২৪ সালে একক হিসাবে মোট মূলধন ছিল ৩ হাজার ৬৬২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকায়। একই সময়ে মূলধন ঘাটতি ১ হাজার ৩৭৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৭৯৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সমন্বিত হিসাবে শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ১ হাজার ৫৪৭ কোটি ২৭ লাখ টাকায় নেমেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ছিল ইতিবাচক ৯৫৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে ইকুইটি কমেছে ২ হাজার ৫০১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৮ টাকা ৫ পয়সায়।
পর্ষদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আইএফআইসি ব্যাংকের আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া স্বতন্ত্র ও শেয়ারধারী পরিচালকদের নিয়ে নতুন পর্ষদ গঠিত হয়। এরপরও ব্যাংকটির আর্থিক সূচকে উন্নতি আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান চেয়ারম্যানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গত মার্চে ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরিদর্শনে পরিচালকদের সম্মানী গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপের বিষয় উঠে আসায় পর্ষদের জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ব্যাংকটির অবনতি কয়েক বছরের আর্থিক হিসাবেও স্পষ্ট। ২০২৩ সালে সমন্বিত নিট মুনাফা ছিল ৩০০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে তা বদলে ১২০ কোটি ৬২ লাখ টাকা লোকসান হয়। একই সময়ে একক হিসাবে খেলাপি ঋণের হার ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ৫৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ১২ দশমিক ৭৪ শতাংশ থেকে কমে নামে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে।
২০২৫ সালে একক হিসাবে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয় ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়ায় ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায়। পরপর দুই বছর লভ্যাংশ দিতে না পারায় ব্যাংকটির শেয়ার ‘জেড’ শ্রেণিতে নেমে যায়।
