জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের পুঁজিবাজারে ব্যবসা করেই লোকসান, অথচ বিনিয়োগের সুদ আর লভ্যাংশের ওপর ভর করে মুনাফায় রয়েছে দেশের দ্বিতীয় স্টক এক্সচেঞ্জ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ-সিএসই। মূল ব্যবসায় টানা তিন অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ থেকে আসা আয়ই প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার অন্যতম ভরসা। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, নিজস্ব ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ছে কেন সিএসই?
সিএসইর আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ১৬ কোটি ৫৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে এই লোকসান ছিল ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, টানা তিন অর্থবছরে পরিচালন লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
অথচ এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে সিএসইর পরিচালন মুনাফা ছিল ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কাছাকাছি।
তবে মূল ব্যবসায় লোকসান হলেও নিট মুনাফায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিএসইর নিট মুনাফা হয়েছে ২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বন্ডে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ থেকে সুদ ও লভ্যাংশের আয় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্ট এক সাবেক পরিচালকের মতে, এই বিনিয়োগ থেকে বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে। ব্যাংকের সুদহার বাড়ায় আয় বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে নিট মুনাফাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিএসইর নিট মুনাফা ছিল ২৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
আর্থিক সূচকেও দেখা যাচ্ছে নিম্নমুখী প্রবণতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ পয়সায়, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৫ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থপ্রবাহ ১ টাকা ৬ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ১ টাকা ৫ পয়সা। সর্বশেষ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ১১ টাকা ৯৩ পয়সা।
সিএসইর ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পুঁজিবাজারে লেনদেন ও বাজারে অংশীদারিত্ব কমে যাওয়া, পণ্যে বৈচিত্র্যের অভাব, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রতিষ্ঠানটির আয় কমিয়ে দিচ্ছে।
সিএসইর একাধিক ট্রেকহোল্ডারের প্রতিনিধির দাবি, এক দশক আগে দেশের পুঁজিবাজারের মোট লেনদেনে প্রতিষ্ঠানটির অংশ ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে কমে তা এখন প্রায় ৩ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের অংশীদারিত্ব। এ ছাড়া গত দুই বছরে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন বন্ধ থাকা এবং নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়াও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএসইর সাবেক এক পরিচালকের মতে, মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথককরণের পরও প্রতিষ্ঠানটির অবস্থার উন্নতি হয়নি। প্রতিযোগিতা বাড়াতে দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে আলাদা পণ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার সম্প্রতি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। অনুমোদন পাওয়া গেলে লেনদেন বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানের অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
এখন দেখার বিষয়, বিনিয়োগের আয়নির্ভরতা কাটিয়ে মূল ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি