মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: অঞ্জলি, আরতি ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে আজ বিজয়া দশমীতে শেষ হচ্ছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দিনের আনুষ্ঠানিকতা।
এরপর দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ, সিঁদুর খেলা ও অন্যান্য আয়োজন শেষে বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৬ দিনের এ উৎসব। গত শুক্রবার দেবীর বোধন ও ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।
মৌলভীবাজার জেলায় শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ বিজয়া দশমী মানেই চোখ ভরা জল আর বিষাদের করুণ সুর। ঢাকের কাঠিতে 'ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন' সুর বাজার সাথে সাথেই বাঙালি হৃদয়ে নেমে আসে এক শূন্যতার অনুভূতি। ৪ দিনের আনন্দ-উল্লাসের পর আজ যেন সবখানে এক নীরব বিষণ্ণতা। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের ভিড়, শেষবারের মতো দেবী দর্শন ও প্রণাম জানাতে ছুটে আসছেন সব বয়সী মানুষ।
বৈদিক শাস্ত্র ও পঞ্জিকা মতে, ৪ দিন ধরে মর্ত্যে অবস্থান করার পর দশমীর দিনে উমা রূপী মা দুর্গা মর্ত্যধাম ছেড়ে শ্রী কৈলাসে মহাদেবের সমীপে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে দেবী বিসর্জন কেবল এক বিচ্ছেদের পর্ব নয়, এটি দেবী দুর্গার সূক্ষ্ম রূপের মহিমাকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং আগামী বছরের জন্য পুনরাগমন প্রার্থনার পরম মুহূর্ত।
শাস্ত্রমতে, এই দিনেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিজয় লাভ করেছিলেন, তাই এর নাম বিজয়া দশমী।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এবার মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিটি মণ্ডপেই দশমীর সকাল থেকে ভক্তদের ঢল নেমেছে। মহা অঞ্জলি, আরতি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনের প্রথম পর্ব সম্পন্ন হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমনা দেব বলেন, প্রতি বছর এই দিনটা এলেই মন ভারী হয়ে যায়। মা যেন নিজের মেয়ে, আবার এক বছরের জন্য বিদায় নিচ্ছেন।
আরেক ভক্ত রতন পাল বলেন, ঢাকের বাজনাটা আজ অন্য রকম লাগে, আনন্দের মাঝেও কান্না লুকিয়ে থাকে।
সনাতন রীতি অনুযায়ী, দুপুরের পর বিবাহিত নারীরা দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ করবেন। এরপর শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। লাল-সাদা শাড়ি পরে নারীরা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেবেন, মঙ্গল কামনা করবেন। এটি কেবল একটি আচার নয়, এটি নারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
বিকেল ৩টা থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হবে। বিসর্জনের জন্য মনু নদীর চাঁদনীঘাট, কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন ঘাটসহ জেলার ২২০টি নির্ধারিত পুকুর ও জলাশয় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি ঘাটে ক্রেন, নৌকা ও আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নদী ও জলাশয়গুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দশমী উপলক্ষে মৌলভীবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে বসেছে বিজয়া মেলা। হস্তশিল্প, মাটির খেলনা ও মিষ্টির দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। পূজা ঘিরে স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। মুদি, ফুল ও আলোকসজ্জা ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি।
ধর্মীয় সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব শেষ করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন আয়োজকরা। সন্ধ্যায় শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ভক্তদের মনে একটাই প্রার্থনা - 'আসছে বছর আবার হবে'।
—জা.অর্থনীতি/এনজে