ইবি প্রতিনিধি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরও আধুনিক, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান। বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism’।
উপাচার্য বলেন, পর্যটন এখন আর শুধু আনন্দ-বিনোদন কিংবা অবকাশযাপনের বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের রয়েছে সমুদ্রসৈকত, নদী, বন, পাহাড়, চা-বাগান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এসব সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সেবার মানের ঘাটতি, যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। বিশ্ব পর্যটন খাতে ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়েছে উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, স্মার্ট পরিকল্পনা, ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে AI পর্যটন খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার বাংলাদেশের পর্যটনসেবাকে আরও আধুনিক, পর্যটকবান্ধব ও বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে AI-নির্ভর পর্যটন হবে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ছোট উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, দায়িত্বশীল পর্যটন আচরণ এবং সাংস্কৃতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, AI, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং ও স্মার্ট হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে পর্যটন গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। তাদের উদ্ভাবনী গবেষণা ও উদ্যোগ টেকসই পর্যটন বিকাশ, প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ব পর্যটন দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি পর্যটন খাতের উন্নয়নে নতুন করে অঙ্গীকার করার দিন। প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে একটি আধুনিক, সেবামুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তি যেন কখনো মানুষের বিকল্প না হয়ে ওঠে; বরং মানুষের সেবা, আতিথেয়তা ও মানবিকতাকে আরও কার্যকর করার মাধ্যম হিসেবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম জুয়েলের সভাপতিত্বে সেমিনারে গেস্ট অফ অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকি, রহিমাফরোজ বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়াজ রহিম। কী নোট স্পিকার ছিলেন অরুণিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব সিইও এবং বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড রুরাল বেসড অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ইরফান আহমেদ।
এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ইদ্রিস আলী, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুস শাহীদ মিয়া, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ এর ডিরেক্টর মো. মহিউদ্দিন সেলিম, এনজিও দিশার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. রবিউল ইসলাম, গোয়িংফ্লাই এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
কী-নোট স্পিকার ইরফান আহমেদ বলেন, পর্যটন খাতের সামগ্রিক রূপান্তর ও টেকসই উন্নয়নে প্রযুক্তি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ব্যবহার দিন দিন অপরিহার্য হয়ে উঠছে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় শিল্প বিপ্লব থেকে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের দিকে ধাবিত হতে ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এআই-এর সঠিক প্রয়োগ একজন পর্যটকের গন্তব্য নির্বাচন, তথ্য অনুসন্ধান, ভ্রমণ পরিকল্পনা, সহজ বুকিং, ভাষা রূপান্তর এবং ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে অনন্য করে তোলার পাশাপাশি ফিরতি যাত্রাও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলে।
তিনি বলেন, হোটেল-রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা, ট্রাভেল অপারেটরদের কম সময়ে উদ্ভাবনী ভ্রমণ প্যাকেজ তৈরি এবং সরকারি পর্যায়ে পর্যটকদের সঠিক তথ্য ক্যাটাগরাইজেশনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এছাড়া কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে লোকাল কমিউনিটি ও ব্যবসায়িক খাতকে সমৃদ্ধ করে টেকসই পর্যটন (সাসটেইনেবল ট্যুরিজম) নিশ্চিতেও এআই ও ডিজিটাল এজেন্ডা যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি