নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের খবরে গতকাল বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির দেখা মিলেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদনের পর বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকসের পর্ষদে পরিবর্তনের খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আগ্রহ তৈরি করে। এর প্রভাবে দুটি কোম্পানির শেয়ারই দিনের সর্বোচ্চ দরসীমার কাছাকাছি উঠে যায়। তবে এ উত্থানের মধ্যেও বাজারে সার্বিক লেনদেন কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যে এখনও বাছাই করা কয়েকটি শেয়ারে সীমিত, দিনের লেনদেন সেই বার্তাই দিয়েছে।
বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকসের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং সালমান এফ রহমানকে পর্ষদ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাগত জটিলতার কারণে কোম্পানি দুটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে পর্ষদ পুনর্গঠনের খবরটিকে বাজারে সম্ভাব্য অচলাবস্থা কাটানোর একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হয়েছে। খবর প্রকাশের পর বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারদর ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২২ টাকা ৫০ পয়সায় এবং শাইনপুকুর সিরামিকসের দর ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২৩ টাকা ৯০ পয়সায় দাঁড়ায়।
বাজারের এ প্রতিক্রিয়া মূলত একটি নির্দিষ্ট করপোরেট খবরে কেন্দ্রীভূত ছিল। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগকারীরা এখনও আগের মতো বিস্তৃতভাবে ঝুঁকি নিচ্ছেন না। এর প্রমাণ মিলেছে লেনদেনের পরিমাণে। প্রধান বাজারে গতকাল লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা যা আগের দিনের তুলনায় ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। অর্থাৎ সূচক বাড়লেও বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। বরং নির্দিষ্ট খবরকে কেন্দ্র করে অর্থের হাতবদলই বাজারের গতিপথে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেনেও একই ধরনের বাছাইয়ের প্রবণতা দেখা গেছে। বস্ত্র খাতে সবচেয়ে বেশি— প্রায় ২৮ শতাংশ লেনদেন হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির পর এ খাতে কিছুটা মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। এনভয় টেক্সটাইল ও সায়হাম টেক্সটাইলে লেনদেন বেশি হলেও খাতটি দিন শেষে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে সিরামিক ও বিবিধ খাত দেড় শতাংশ করে বেড়েছে যেখানে শাইনপুকুর সিরামিকসের বড় দরবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাংক খাতেও কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা ছিল। পূবালী ব্যাংকের শেয়ারদর ২ শতাংশ বেড়ে সূচকে প্রায় ৩ দশমিক ২ পয়েন্ট যোগ করেছে। তবে ব্যাংক খাতের মোট লেনদেন আগের দিনের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে ওরিয়ন ইনফিউশনের মতো উচ্চ মূল্যায়নের শেয়ারে বিক্রির চাপ দেখা গেছে; কোম্পানিটির দর ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ কমেছে।
বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আধিপত্যও স্পষ্ট ছিল। দিনের মোট লেনদেনের ৯০ দশমিক ৫৬ শতাংশ এসেছে খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল মাত্র ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে ব্লক মার্কেটে বড় অঙ্কের হাতবদল হয়েছে। ২৫টি সিকিউরিটিজে ৮০টি লেনদেনের মাধ্যমে মোট ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়। সায়হাম টেক্সটাইল, স্কয়ার ফার্মা, অ্যাপেক্স স্পিনিং ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য ব্লক লেনদেন দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, গতকালের বাজারে সূচকের সাধারণ উত্থান নয়, বরং নির্দিষ্ট করপোরেট খবরে বিনিয়োগকারীদের তাৎক্ষণিক সাড়া। ডিএসইএক্স ১১ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে উঠলেও লেনদেন কমেছে। ৩৮৫টি কোম্পানির মধ্যে ১৭১টির দর বেড়েছে, ১৫০টির কমেছে এবং ৬৪টির অপরিবর্তিত ছিল।
এ অবস্থায় সামনে বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বেক্সিমকো গ্রুপের পর্ষদ পুনর্গঠনের পর বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রম কতটা স্বাভাবিক হয় এবং অন্যান্য কোম্পানির বার্ষিক আর্থিক ফলাফল ও লভ্যাংশের ঘোষণা কেমন আসে। আপাতত বিনিয়োগকারীদের আচরণ বলছে, সামগ্রিক বাজারে বড় অবস্থান নেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট খবর ও সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের গল্পকে ঘিরেই মূলধন ঘুরছে।