পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের করের বোঝা কতটা বাড়াবে?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

কাগজে-কলমে বেতন দ্বিগুণ বাড়ল, কিন্তু মাস শেষে পে-স্লিপ দেখে চক্ষু চড়কগাছ! বেতন বাড়লেই কি পুরো বাড়তি টাকা আপনার পকেটে ঢুকছে, নাকি এর একটা বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছে আয়কর? নতুন পে স্কেলে কার লাভ আর কার ক্ষতি।

নতুন পে স্কেলে বেতন বাড়ছে-কেউ পাচ্ছেন উল্লেখযোগ্য হারে বেশি মূল বেতন, কারও ক্ষেত্রে তা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বেতন বাড়লেই কি পুরো বাড়তি টাকা কর্মীর হাতে থাকবে? নাকি বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়করও পাল্লা দিয়ে বাড়বে, আর মাস শেষে দেখা যাবে-বেতন যতটা বেড়েছে, হাতে আসা টাকা বেড়েছে তার চেয়ে অনেক কম?

সরকারি কর্মীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে আলোচিত হিসাবগুলোর একটি এটিই। কারণ নতুন জাতীয় পে স্কেল ২০২৬-এ গ্রেড ২০-এর সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর গ্রেড ১-এর সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এই নতুন কাঠামো কার্যকর হয়েছে এবং মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কাগজে-কলমে বেতন বাড়ছে বড় অঙ্কে, কিন্তু ঠিক এখানেই চলে আসছে আয়করের হিসাব।

২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য সাধারণ ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এরপরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য। এর পরের অবশিষ্ট আয়ের ওপর রয়েছে ৩০ শতাংশ করহার।

তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি-কোনো কর্মী নতুন করে একটি উচ্চ কর স্তরে ঢুকলেই কিন্তু তার পুরো বেতনের ওপর সেই উচ্চ হারে কর বসে না। কর হিসাব করা হয় ধাপে ধাপে।

ধরা যাক, কারও করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করল। তখন প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কোনো কর নেই। এরপরের অংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর শুরু হবে। আয় আরও বাড়লে পরবর্তী অংশে ১৫ শতাংশ, তারপর ২০ শতাংশ, ২৫ শতাংশ এবং নির্দিষ্ট সীমার পর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অর্থাৎ বেতন বাড়ার কারণে করের অঙ্ক বাড়লেও, পুরো বেতনের ওপর একসঙ্গে সর্বোচ্চ করহার বসে যাওয়ার ধারণাটি সঠিক নয়।

তাহলে নতুন পে স্কেলে কার ওপর করের চাপ বেশি পড়বে?

যাদের মোট করযোগ্য আয় আগে করমুক্ত সীমার কাছাকাছি ছিল, বেতন বৃদ্ধির ফলে তারা এখন করের আওতায় আসবেন। আবার যারা আগে থেকেই আয়কর দিতেন, তাদের আয় বাড়ায় তারা পরবর্তী কর ধাপে চলে যেতে পারেন। তখন অতিরিক্ত আয়ের একটি অংশের ওপর বেশি হারে কর গুণতে হবে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে গ্রস বেতন আর নিট আয়ের পার্থক্য। মূল বেতন বেড়ে যাওয়া মানেই সরাসরি হাতে পাওয়া টাকা বেড়ে যাওয়া নয়। আয়কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য সরকারি কর্তন বাদ দেওয়ার পর যে টাকা পাওয়া যায়, সেটিই বাস্তব নিট আয়। তাই প্রশ্ন শুধু ‘বেতন কত বাড়ল’ তা নয়, আসল প্রশ্ন হলো-‘কর কাটার পর হাতে কত থাকছে?’

অবশ্যই পে স্কেলের মূল বেতন আর করযোগ্য মোট আয় এক জিনিস নয়। কোন কোন ভাতা ও আয় করযোগ্য, আর কোনগুলো ছাড়ের আওতায় পড়ে-তাও দেখতে হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, বেতন কিন্তু একবারে পুরোটা কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে, আর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০৮৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

তাই নতুন পে স্কেলের প্রকৃত সুবিধা বুঝতে হলে শুধু বেতন বৃদ্ধির শতাংশ দেখলে চলবে না; দেখতে হবে কর কাটার পর পে-স্লিপের নিচের লাইনে আসল নিট আয় কত দাঁড়াল।

পে স্কেলে বেতন বাড়লেই আসছে করের ধাক্কা

কাগজে-কলমে বেতন দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়লেও মাস শেষে আপনার হাতে কত টাকা থাকছে? নতুন পে স্কেল ২০২৬-এ মূল বেতন ব্যাপক বাড়লেও আসল খেলাটা কিন্তু আয়করে। ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত সীমা পার হলেই ধাপে ধাপে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রযোজ্য হবে। আপনার গ্রেড যত ওপরে, করের কোপ তত বেশি! তাই ‘বেতন কত বাড়ল’ সেই চিন্তা বাদ দিয়ে হিসাব করুন-সব সরকারি কর্তন আর ট্যাক্স কাটার পর আপনার পে-স্লিপের নিচের লাইনে আসল নিট আয় কত বাড়ল!

পে স্কেলের বড় বেতন মানেই বড় কর

উচ্চ পে স্কেলে বেতন বাড়লেই কি পুরো টাকার ওপর সর্বোচ্চ ট্যাক্স কেটে নেবে সরকার? উত্তর হচ্ছে-না! ট্যাক্সের হিসাব হয় ধাপে ধাপে। আপনার বেতনের প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা সম্পূর্ণ করমুক্ত। বাড়তি বেতনের ওপর ১০, ১৫ বা ২০ শতাংশ হারে কর বসবে। তাই ভয় না পেয়ে হিসাব করুন-বেতন বাড়ায় আপনি কি নতুন কর ধাপে ঢুকছেন, নাকি ভাতা আর কর-ছাড়ের সুবিধা মিলিয়ে এখনো আপনার নিট আয় আগের চেয়ে অনেকটাই বেশি থাকছে!  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি