নেপালে আবারও ভূমিধস, পাহাড়ে আটকা পড়াদের হেলিকপ্টারে উদ্ধার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত ও একাধিক ভূমিধসে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু এবং আরও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই দেশটি আবারও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ল।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষদিক থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯০০-র বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২৪০টিরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ি সড়ক, অবকাঠামো ও সেতু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

নেপালের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি 'অন্নপূর্ণা সার্কিট'-এ ভ্রমণে যাওয়া শত শত পর্বতারোহী ও পর্যটক নিজেদের রক্ষার্থে সফর সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হয়েছেন। এ পথের মানাং ও মুস্তাং জেলা থেকে বহু পর্যটককে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রাজধানী কাঠমাণ্ডুর উত্তর-পশ্চিমে বাটার এলাকার একটি সিক্ত নীল তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া বুটি তামাং বলেন, 'আমরা আগে একটা কুঁড়েঘরে থাকতাম, এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমাদের অনেক আত্মীয়কে হারিয়েছি।'

বাড়িঘর ছেড়ে আসা রামেশ ঘালে বলেন, 'এখনও বৃষ্টি হচ্ছে আর তাঁবুর ফুটো দিয়ে পানি পড়ছে। ভীষণ কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে আমাদের। কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা নেই।'

বেশ কয়েকজন পর্বতারোহী ও গাইড জানান, পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নেমে আসার যাত্রাটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভেঙে পড়া সড়ক ও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া সেতু পার হয়ে নিচে নামতে তাদের ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে।

গত সপ্তাহে ভারী তুষারপাতের কারণে ঊর্ধ্ব মানাংয়ের ইয়াক খড়ক এলাকায় নিজের গাইডের সঙ্গে আটকে পড়েন যুক্তরাজ্যের সাফোকের বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী জেক স্টেসি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে তিনি এই ট্র্যাকিং পথের সর্বোচ্চ বিন্দু 'থোরোং লা পাস'-এর দিকে আর না এগোনোর সিদ্ধান্ত নেন।

মঙ্গলবার রাতে পোখরা বেস ক্যাম্প-এ ফিরে এসে তিনি বলেন, 'আমাদের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিজেদের পথ তৈরি করে নিতে হয়েছে। পথটি বেশ খাড়া ছিল এবং নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত থাকায় আমাদের হামাগুড়ি দিয়ে পথ চলতে হয়েছে... চারপাশ খুব কর্দমাক্ত ও ভেজা ছিল।'

তিনি আরও বলেন, 'অনেক পর্যটককেই হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।'

অস্ট্রেলীয় পর্যটক অ্যান্ড্রু গ্র্যাহাম এবং তার গাইড প্রেম কেসি জানান, মানাং গ্রাম থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাদের ১৫টিরও বেশি ভূমিধস এলাকা পার হতে হয়েছে। গ্র্যাহাম বলেন, 'এর মধ্যে কয়েকটি পথ খুবই বিপজ্জনক ছিল এবং পথজুড়ে ঝুঁকির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছিল।'

তিনি আরও জানান, ভূমিধসের ঝুঁকিতে মানুষকে সরিয়ে নেয়া চামে গ্রামে পৌঁছে তারা আটকে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে একটি রাত জঙ্গলেই কাটাতে হয়।

একটি বিশাল ভূমিধসের কারণে চামে গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীটির গতিপথ আংশিক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদের পানিতে বসতবাড়ি ও একটি প্রধান সেতু তলিয়ে গেছে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিগত তিন দিন ধরে এক্সেভেটর (খননযন্ত্র) ব্যবহার করে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চালাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ, তবে এখনও বিশেষ সাফল্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে ট্রেকিং গাইড সে রিং ডোমা জানান, তাকে এবং তার দলকে ২৮টি ভূমিধস পার হতে হয়। গত মাসের ভয়াবহ দুর্যোগের টাটকা স্মৃতি মনে থাকায় শারীরিক কষ্টের চেয়ে মানসিক চাপই তাদের জন্য বেশি কঠিন হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, 'এমনকি মেঘের ডাক শুনলেও আমরা দৌড়ে বাইরে এসে দেখতাম আমাদের দিকে নতুন কিছু ধেয়ে আসছে কি না।'

নরওয়ের পর্যটক এলেন ওয়ালস্ট্রোম বলেন, 'পর্যটকরা তবু ভাগ্যবান—কারণ তাদের হয়তো কেবল কিছু জিনিসপত্র ফেলে যেতে হচ্ছে, অথচ স্থানীয় মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।' তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুতগতিতে অনেক জায়গার ভূমিধস পরিষ্কারের কাজ করে চলেছে।'

চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার মুক্তি প্রসাদ খনাল জানান, মানাং জেলায় অবকাঠামোগত ক্ষতি বেশ ভয়াবহ—বেশ কয়েকটি সেতু ভেসে গেছে এবং কিছু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তবে ভাগ্যক্রমে এই ট্র্যাকিং অঞ্চলে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি।

তবে তিব্বত সীমান্তের কাছে অবস্থিত হিমলুং পিক-এর পাদদেশে তুষারধসের পর চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনও ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

স্থানীয় ট্র্যাকিং কর্তৃপক্ষ 'অন্নপূর্ণা কনজারভেশন এরিয়া প্রজেক্ট'-এর এক প্রতিনিধি জানান, প্রায় ৭০০ পর্বতারোহী ও পর্যটক এখনও অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্র্যাকিং শুরু করার জন্য পোখরায় অপেক্ষা করছেন।

তিনি বলেন, 'অন্নপূর্ণা সার্কিট রুটটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণার জন্য ট্র্যাকিং সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর চাপ রয়েছে, তা সত্ত্বেও আমরা এই মুহূর্তে ভ্রমণপ্রত্যাশীদের আটকে রেখেছি।'

তিনি আরও জানান, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় প্রাচীন সনাতন তীর্থক্ষেত্র মুক্তিনাথ দর্শনে আসা ভারতীয় দর্শনার্থীদের গাড়ি করে নামার পরিবর্তে জোমসোম থেকে বিমানযোগে পোখরায় ফেরার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি সড়ক ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর অন্নপূর্ণা সার্কিটের বেশিরভাগ পুরনো ট্র্যাকিং পথই অব্যবহৃত পড়ে ছিল, কেবল মানাং ও মুস্তাং জেলার সামান্য কিছু অংশ ছাড়া।

তবে পর্যটন ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা (অপারেটর) জানান, সার্কিটের বেশ কিছু অংশের মূল সড়কগুলো ধসে পড়া ও ভেসে যাওয়ায়, এখন অনেক পর্যটকই নিচে নেমে আসার জন্য সেই পরিত্যক্ত পুরনো পথগুলো ব্যবহার করছেন।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ