সোলারে সরকারের মহৎ উদ্যোগ, এসআরওতে কেন বৈষম্য?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। বাজেটেও ঘোষণা এসেছে সৌর সরঞ্জামে করছাড়ের। কিন্তু প্রজ্ঞাপন বা এসআরও জারির পর দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র- বড় প্রকল্পে শুল্ক কমলেও সাধারণ খুচরা বাজারে দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ! সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ কি আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচেই আটকে যাচ্ছে?

কাগজ-কলমে করছাড়ের কথা বলা হলেও এসআরও-এর ভেতরের হিসাবে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত বৈষম্য।

একই সোলার ইনভার্টার বড় ইপিসি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্পের জন্য শুল্ক কমিয়ে ১৭ শতাংশ করা হলেও সাধারণ পরিবেশক ও খুচরা আমদানিকারকদের জন্য তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৮ শতাংশ!

প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রেও ছাড়ের সুফল কেবল বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

অথচ দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৩ শতাংশই আবাসিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক খাতের। সাধারণ মানুষের জন্য ইকুইপমেন্টের দাম না কমলে ১০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কার্যত অসম্ভব।

শুল্ক ছাড় পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকেও করা হয়েছে অত্যন্ত জটিল।

ছাড় পেতে হলে আমদানির আগেই নির্দিষ্ট লে-আউট অনুমোদন, আন্তর্জাতিক সনদ, তিনশত টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা এবং মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রজেক্ট চালু করে সরেজমিন পরিদর্শনের কড়া সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

একটি শর্ত বা ডেডলাইন মিস হলেই পুরো সুবিধা বাতিল হয়ে জরিমানার মুখে পড়তে হবে।

ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আইনি ঝামেলার ভয়ে করছাড় নেওয়ার সাহসই পাচ্ছেন না। একটি সুবিধা নেওয়ার চেয়ে যদি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশি ভীতিজনক হয়, তবে সেই প্রণোদনা বাস্তবে কোনো কাজে আসে না।

আরেকটি নীরব বাধা হলো প্যানেলের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি।

একটি আধুনিক প্যানেলের প্রকৃত ইনভয়েস মূল্য যেখানে প্রায় ৫০ ডলার, সেখানে কাস্টমসে ওজন ধরে তার শুল্কায়ন মূল্য ধরা হচ্ছে ১১০ ডলার- অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি!

ভিত্তিমূল্য বেশি হওয়ায় শুল্ক ও ভ্যাটের বোঝাও বাড়ছে মারাত্মকভাবে।

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে দরকার সহজ তিনটি সিদ্ধান্ত:

প্রথমত, প্রকল্প নয়, সব সৌর পণ্যের ওপর সবার জন্য এক ও অভিন্ন শুল্ক সুবিধা চালু করা।

দ্বিতীয়ত, ওজনভিত্তিক শুল্কায়ন বাতিল করে প্রকৃত লেনদেনমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা।

তৃতীয়ত, অনুমোদনের জটিলতা কমিয়ে পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার দিকে নজর দেওয়া।

সৌর সরঞ্জাম কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান চাবিকাঠি।
প্রণোদনা যখন কেবল নির্দিষ্ট কয়েকজনের ঘরে না থেকে সাধারণ প্রতিটি নাগরিকের ছাদে পৌঁছাবে, তখনই সফল হবে গ্রিন এনার্জির জাতীয় স্বপ্ন।

সোলারে করছাড়ের আড়ালে কী ঘটছে?

বাজেটে বলা হলো সোলার প্যানেল ও সরঞ্জামে করছাড় দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ বাজারে ইনভার্টারের শুল্ক বেড়ে গেছে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত! শুধু বড় প্রজেক্টের জন্য শুল্ক কমানো হলেও সাধারণ ছাদবাগান বা আবাসিক গ্রাহকের জন্য কেনাকাটা হয়ে গেছে আরও ব্যয়বহুল। সবার জন্য এক শুল্ক নীতি না থাকলে সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব কীভাবে আসবে?

সোলার প্যানেলের দাম দ্বিগুণ কেন?

যে সোলার প্যানেলের আসল আমদানিমূল্য ৫০ ডলার, কাস্টমসে ওজন মেপে তার দাম ধরা হচ্ছে ১১০ ডলার! অর্থাৎ ভিত্তিমূল্য দ্বিগুণ হওয়ায় অতিরিক্ত শুল্ক ও ভ্যাট গুণতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাকেই। প্রকৃত লেনদেনমূল্যে শুল্কায়ন নিশ্চিত না করলে দেশে সৌরবিদ্যুৎ সস্তা হবে কীভাবে? আপনার কী মনে হয়?  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি