আধুনিক বিজ্ঞানের প্রকৃত জন্মদাতা কারা?

দশম ও একাদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে পৃথিবীতে এমন এক মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছিল, যার জ্ঞানতৃষ্ণা আর আবিষ্কারের নেশা মানবসভ্যতাকে কয়েক শতাব্দী এগিয়ে দিয়েছিল। তিনি আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-বেরুনী। অধ্যাপক মাপা যথার্থই বলেছেন, আল-বেরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি।

৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে খাওয়ারিজমে জন্ম নেওয়া আল-বেরুনীর শৈশব ও শিক্ষা জীবন ছিল কঠোর সাধনার। জীবনের দীর্ঘ ২২টি বছর তিনি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞানচর্চা করেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতায় কখনো তাকে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে, কখনো কাটাতে হয়েছে অনাহারে। কিন্তু কোনো প্রতিকূলতাই তার জ্ঞানতৃষ্ণাকে দমাতে পারেনি। গজনীর সুলতান মাহমুদের সান্নিধ্যে এসে তার গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।

সুলতান মাহমুদের সাথে ভারত সফরে এসে আল-বেরুনী এদেশের সমৃদ্ধ শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনে মুগ্ধ হন। তিনি ১০১৯ থেকে ১০২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দু পণ্ডিতদের সাথে গণিত ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে মতবিনিময় করেন। তার রচিত কিতাবুল হিন্দ আজও তৎকালীন ভারতের ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থা জানার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।

আল-বেরুনী ছিলেন একাধারে জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, ভাষাবিদ ও ভূতত্ত্ববিদ। তার বৈপ্লবিক কিছু অবদান আধুনিক বিজ্ঞানকেও হার মানায়:

পৃথিবীর গতি ও আকার: কোপার্নিকাসের জন্মের ৪২৫ বছর আগেই আল-বেরুনী প্রমাণ করেছিলেন যে পৃথিবী তার নিজের অক্ষে আবর্তিত হয়। তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন।

কানুনে মাসউদ: এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ১১ খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান, ত্রিকোণমিতি এবং গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

গণিতের জাদুকর: বর্তমান বিশ্বে নিউটনীয় ফর্মুলা বা The Formula of Interpolation নামে যা পরিচিত, নিউটনের জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগেই আল-বেরুনী তা আবিষ্কার ও ব্যবহার করেছিলেন।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান: তিনিই প্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও আর্টেসীয় কুপের রহস্য উদঘাটন করেন। এমনকি ফুলের পাপড়ির সংখ্যা যে গাণিতিক নিয়মে (৩, ৪, ৫, ৬ বা ১৮) হয়, কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হয় না—এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণও তারই ছিল।

আরবি, ফারসি, গ্রিক, হিব্রু ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত এই মনীষী ১১৪টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তার রচিত গ্রন্থগুলো আজও ইতিহাসের সম্পদ। তিনি শব্দের গতির সাথে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন এবং এরিস্টটলের দর্শনের সীমাবদ্ধতাগুলো যুক্তিসহ তুলে ধরেছিলেন।

১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ৭৫ বছর বয়সে এই মহাজ্ঞানী পরলোকগমন করেন। আল-বেরুনী বিশ্বাস করতেন, সমস্ত জ্ঞানের উৎস মহান আল্লাহ। তার জীবন আমাদের শেখায় যে, অধ্যবসায় আর সত্যের অন্বেষণ থাকলে একজন মানুষ পুরো পৃথিবীকে আলোর পথ দেখাতে পারেন। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যে বিশাল অট্টালিকা, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আল-বেরুনীর মতো মুসলিম বিজ্ঞানীরাই। ইতিহাসে তার নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে চিরকাল জ্বলজ্বল করবে।

 

 জা. অর্থনীতি/ উমর