ধর্ষণের ভয়াবহতা ও নারীর নিরাপত্তা

ইঞ্জিনিয়ার আকাশ চন্দ্র দাস: প্রতিদিনের আতঙ্ক, একের পর এক নির্যাতনের খবর এবং বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা! কতটা নিরাপদ বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা? 

বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনা আমাদের সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে। সংবাদমাধ্যমে যখন একের পর এক ধর্ষণ ও নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, মানুষের মনুষ্যত্ববোধ কি আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে? একটি সভ্য সমাজে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কি এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি?

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে ৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৭ জন শিশু ও কিশোরী। 

যে দেশে একজন নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, সেখানে নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যে দেশে কোনো শিশুর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যদের মনে অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।

আজ কোনো ধর্ষণের খবর সামনে এলে শুধু একটি অপরাধের বিবরণ প্রকাশিত হয় না; সামনে আসে একটি পরিবারের অসহায়ত্ব, একজন ভুক্তভোগীর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতি এবং সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ। 

যে দেশে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়াটাও বিষাক্ত সাপের ছোবলের মতো আতঙ্কের মনে হয়, সেই দেশের বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে মা-বাবার উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ফিরবে এবং বিপদে পড়লে কার সাহায্য নেবে এসব বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। তবে সন্তানকে একা কোথাও যেতে না দেওয়াই ধর্ষণ প্রতিরোধের সমাধান হতে পারে না। একজন নারী কিংবা শিশু কোথায় যাবে, কখন যাবে বা কার সঙ্গে যাবে এসবের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করে অপরাধের মূল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কোনো পোশাক, চলাফেরা, সময় কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ধর্ষণের জন্য ভুক্তভোগীকে দায়ী করে না। অপরাধের দায় অপরাধীরই।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহন, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। অপরাধ প্রতিরোধে শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা যথেষ্ট নয়; আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, অভিযোগকারী নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারছেন কি না এবং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্ব হচ্ছে কি না? এসব বিষয়েও জবাবদিহি জরুরি। ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য মানসিক, আইনি ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অনেক ভুক্তভোগীকে সামাজিক অপবাদ, অবিশ্বাস কিংবা হয়রানির আশঙ্কার মুখোমুখি হতে হয়। এমন পরিস্থিতি অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলার পথ আরও কঠিন করে তোলে। সমাজকে বুঝতে হবে, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ নয়, তার পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার পরিচয়।

ধর্ষণ কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত। এই অপরাধ প্রতিরোধে পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ সবকিছুরই প্রয়োজন।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো মা সন্তানকে ঘর থেকে বিদায় দেওয়ার সময় অজানা আতঙ্কে ভুগবেন না। যেখানে কোনো নারীকে নিরাপত্তার জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে না। যেখানে কোনো শিশুর শৈশব অপরাধীর পাশবিকতার কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে না।

প্রশ্নটি শুধু কতটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এসব অপরাধ প্রতিরোধে আমরা কী করছি, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কতটা সফল হচ্ছি।

আর কত মায়ের বুক খালি হলে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে? আর কত নারী ও শিশুর জীবন বিপর্যস্ত হলে আমরা নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব?

এখন সময় শুধু ক্ষোভ প্রকাশের নয়; কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, অর্থনীতি কিংবা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই দেশের নারী ও শিশুরা ভয় নয়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

প্রতিষ্ঠাতা, নেক্সসফেয়ার