জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা। এর আগে তিনি গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের অধ্যাপক ও ডিন ছিলেন। অধ্যাপনা করেছেন রুয়েট ও চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগেও। প্রকাশ হয়েছে তার অনেক গবেষণা নিবন্ধ। সম্প্রতি এলপিজি বাজারের কতিপয় ব্যবসায়ীর অবৈধ নিয়ন্ত্রণসহ এ খাতের নানা অনিয়ম, সমস্যা ও সমাধানের কথা বলেছেন ‘জাতীয় অর্থনীতি’র সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশের এলপিজি বাজারের ৯৯ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায় বাজারের প্রতিযোগিতা, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে কী ধরনের কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে? এলপিজি বাজারে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
এম শামসুল আলম: এখানে দুটি বিষয় সমান্তরালভাবে দেখা দরকার। এর আগে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে দেশে তেলের সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। অথচ অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া যায়নি। এমনকি বিভিন্ন স্থানে তেলের কালোবাজারও গড়ে ওঠে। এশিয়াটিক কোম্পানির লরি তেল নিয়ে ডিপো থেকে বেরিয়েছে, গন্তব্যে পৌঁছেনি। পরবর্তী সময়ে দাম বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
জ্বালানি তেলের আমদানি সিংহভাগ সরকারের নিজের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বিপণন বেসরকারি খাতে থাকায় কিছু ব্যবসায়ী সংকটের সুযোগ নিয়ে কালোবাজারে তেল বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা করেছে। অথচ এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও বিপণনে অসাধু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না।
এবার এলপিজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। কারণ এখানে আমদানি থেকে শুরু করে বিতরণ ও বিপণন পর্যন্ত প্রায় পুরো ব্যবস্থাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে— এমন দাবি করে বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা বলা হয়। এর প্রভাবে কোনো কোনো স্থানে বিইআরসির নির্ধারিত দাম অপেক্ষা অস্বাভাবিক বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হয়। দেখা যায়, ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কিন্তু আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। মাসে দেশে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হওয়ার কথা, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা যায়, কোনো ঘাটতি ছিল না। অর্থাৎ আমদানি পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে সংকট তৈরি হয়।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তেও সুনির্দিষ্ট পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে এলপিজি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠে এসেছে। অন্যদিকে বিতরণকারীরা বলছেন, আমদানিকারকদের কাছ থেকে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে বলে খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করলেও আমদানি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা কার্যত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে আছেন।
এখানেই কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। দেশে ২৮টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত থাকলেও কার্যত পাঁচটি বড় কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা কারা, তা আর অজানা নেই। অর্থাৎ বাজারে প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত। অলিগোপলি প্রতিষ্ঠিত।
ওইসব কোম্পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের মতো করে বাজার পরিস্থিতি তৈরি করে নিয়েছে। তারা বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি না করে বেশি মূল্যে বিক্রি করে।
অথচ এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। আমার মতে, প্রতিযোগিতা কমিশন, বিইআরসি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তাই এ পরিস্থিতি তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ। কার্যত এলপিজি বাজারের ওপর কতিপয় ব্যবসায়ীর অবৈধ নিয়ন্ত্রণই সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কারণ। এলপিজি আমদানি ও বিতরণের একটি বড় অংশ সরকারের হাতে আনা না হলে এলপিজির বাজার ওলিগোপলি মুক্ত হবে না। ভোক্তা জ্বালানি সুবিচার পাবে না।
জাতীয় অর্থনীতি: বিইআরসি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে কোথাও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ার পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট নাকি নজরদারির অভাব— কোন বিষয়টি বেশি দায়ী?
এম শামসুল আলম: নজরদারির দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোই যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে নজরদারির প্রশ্ন আসে কীভাবে? বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিইআরসির কাছে অভিযোগ এসেছে। এমনকি পদ্ধতিগতভাবে বিইআরসির নিকট অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পরও বিইআরসি অভিযুক্ত অর্থাৎ কথিত ওই পাঁচ এলপিজি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং তারা যখন দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন, বিইআরসি তা দ্রুত আমলে নিয়েছে। শুনানির পরবর্তী পক্ষরা প্রতিনিধির প্রতিবেদন বিশ্লেষণের জন্য একদিনও সময় নেয়নি। কার্যত এক কার্যদিবসের মধ্যেই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ও আদেশ দেয়। অথচ সেই বর্ধিত দামেও বাজারে এলপিজি মেলে না।
এই অবস্থা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শুধু ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা নয়; বরং বাজারে সেই দাম কার্যকর হচ্ছে কিনা, সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কিনা এবং ভোক্তারা নির্ধারিত মূল্যে পণ্য পাচ্ছেন কিনা— তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বিইআরসির কার্যক্রমে সেই দায়িত্ব পালনের প্রতিফলন নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন এবং বেপরোয়া। অর্থাৎ এলপিজি বাজার ওলিগোপলির শিকার।
জাতীয় অর্থনীতি: মাত্র ২৮ দিনের ব্যবধানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা যৌক্তিকভাবে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতিফলিত হচ্ছে? আমদানি নির্ভরতার পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কি কোনো অসংগতি রয়েছে?
এম শামসুল আলম: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে— এমন বক্তব্যের সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই। সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে ভোক্তাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সুরক্ষা দিতে হয়। শুধু এলপিজি নয়, আমদানিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও সরকার বিভিন্ন সময় কর ও শুল্ক ছাড় দিয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু জ্বালানির ক্ষেত্রে সেই ধরনের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
এলপিজির মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। গণশুনানির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিয়ে মূল্য নির্ধারণের কথা। কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে ব্যবসায়ীদের নিয়েই মূল্য নির্ধারণ হয়। মূল্য নির্ধারণ তাদের দ্বারা প্রভাবিত।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ীরা নিজেরাই বিইআরসিতে বসে দরজা বন্ধ করে মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব তৈরি করেন। পরে তা বিইআরসির অনুমোদনে মূল্যবৃদ্ধির আদেশ হয়। ফলে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, বিপণন ব্যয় ও যৌক্তিক মুনাফার হিসাব কতটা যথাযথভাবে বিবেচিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিইআরসি যে দাম নির্ধারণ করছে, বাজারে ভোক্তারা সেই দামেও এলপিজি পাচ্ছেন না। অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ।
জাতীয় অর্থনীতি: ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এলপিজি বাজারে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকির ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এলপিজি বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো কিংবা সরকারি ভর্তুকি চালু করা কতটা সম্ভব ও যৌক্তিক?
এম শামসুল আলম: জ্বালানি একটি সেবামূলক খাত। কিন্তু আমাদের দেশে বাণিজ্যিক খাত। সরকার একদিকে এ খাত থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব পায়, অন্যদিকে মুনাফাও পায়। অর্থাৎ সরকার মুনাফাখোর বলে অভিযুক্ত। ফলে ব্যবসায়ী কর্তৃক এলপিজি খাতের লুণ্ঠন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায় না।
এই বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। আশপাশের অনেক দেশ জ্বালানিকে নাগরিকদের জন্য সেবা হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানি বাণিজ্যিক পণ্য। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অকার্যকর হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ খাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। বৈধ-অবৈধ বিভিন্ন উপায়ে বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার কাঠামোগত পদ্ধতিও তৈরি হয়েছে।
মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যে অসংগতি রয়েছে, তা দূর করে বিইআরসিকে আন্তর্জাতিক মানের একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোগত পদ্ধতির মধ্যে আনা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে বিইআরসি ও জ্বালানি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যক্রমে ব্যবসায়ীদের মুনাফা সুরক্ষা এবং বাজারে তাদের আধিপত্য বিস্তারের পদ্ধতিগত সুযোগ রয়েছে।
ফলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এলপিজির দামের তুলনা করলেই এ খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এটি একটি অস্বাভাবিক ও ভোক্তাবিরোধী নীতি কাঠামো।
জাতীয় অর্থনীতি: ভারতে উজ্জ্বলা প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও এলপিজি কার্ড চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের কার্ডভিত্তিক ভর্তুকি বাস্তবায়নে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক প্রস্তুতি প্রয়োজন? বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কীভাবে এর আওতায় আনা সম্ভব?
এম শামসুল আলম: প্রথমে দেখতে হবে, সরকার নিজেই এ খাতে কী ধরনের ভূমিকা পালন করে। আমার জানা মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত এলপিজি কোম্পানির পক্ষ থেকে হিসাব দেওয়া হয়েছিল যে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার প্রায় ৬০০ টাকায় সরবরাহ করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে সেটিকে ৮০০ টাকা নির্ধারণ করে কোম্পানির জন্য মুনাফার ব্যবস্থা করা হয়। এখন সেই মুনাফা আরও বাড়িয়ে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, সরকার যদি সত্যিকার অর্থে দরিদ্র মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে মুনাফামুক্ত করে সাশ্রয়ী মূল্যে এই এলপিজি দিয়ে তাদের সহায়তা করা হচ্ছে না কেন? কেন এলপিজির দাম বাড়িয়ে মুনাফা বৃদ্ধি? ঢাকা শহরের বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা গৃহকর্মী, গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় কাজ করে আমাদের নগরজীবন সচল রাখেন, তাদের জীবনযাত্রার একটি বড় সংকট, ন্যূনতম ব্যয়ে রান্নার জ্বালানি অনিশ্চয়তা। সরকার যদি ভর্তুকি দিয়ে এসব মানুষের কাছে কম দামে এলপিজি পৌঁছে দিতে পারতো, তাহলে সেটিই হতো প্রকৃত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ।
বিইআরসি কর্তৃক সরকারি এলপিজির মুনাফা বৃদ্ধির আদেশ দরিদ্রের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের এলপিজি কার্ডের সাথে সাংঘর্ষিক। তবে মূল বিষয় হলো জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা সংরক্ষণে জ্বালানিকে জনগণের মৌলিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু একটি কার্ড চালু করলেই হবে না, এর পেছনে কার্যকর ভর্তুকি ও জবাবদিহিমূলক বিতরণব্যবস্থা না থাকলে তা হবে সরকারি অর্থ তসরুপের অপর একটি কাঠামোগত নতুন পদ্ধতি।
জাতীয় অর্থনীতি: দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম অনেক বেশি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, জ্বালানির বিকল্প উৎস ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এলপিজির দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় কী হওয়া উচিত?
এম শামসুল আলম: রাষ্ট্রের দর্শন কল্যাণ করে জনগণের মঙ্গল করা। শুধু এলপিজি নয়, পুরো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে সেবামূলক খাতে রূপান্তর করে সেই দর্শন সরকারকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং মুনাফা করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার নিজে মুনাফাভোগী না হলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা অনেকটাই কমত এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত হতো। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হতো।
সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত থেকে যে রাজস্ব আদায় করে, তা পুরোপুরি সাধারণ বাজেটের আয় হিসেবে ব্যবহার না করে একটি অংশ এ খাতের মূল্য স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যয় করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সেই অর্থ দিয়ে মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব।
সরকার যদি নীতিগতভাবে এ দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে ভোক্তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়। প্রয়োজনে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সামান্য অংশ ছাড় দিয়েও জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের নীতিতে যদি এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে দেশের মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
জাতীয় অর্থনীতি: এলপিজি বাজারে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরকারের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় কী? বিশেষ করে যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
এম শামসুল আলম: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আইনি কাঠামোতে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনসহ বিইআরসির আইনে ব্যবসায়ীদের অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। যারা বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিযোগ্য অপরাধের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে মামলা করার মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি ক্ষমতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে আমরা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখি না। আমার মতে, যে পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
তাহলে বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত হবে কীভাবে? দেশে তো আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এ ব্যবসায় যুক্ত হতে আগ্রহী। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিধিনিষেধ ও নানা শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এ খাতে ব্যবসা করার সক্ষমতা হারিয়েছে। তাদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত হতে হবে।
এ খাতে আমদানিকারক, পরিবেশক, বাটলার ও খুচরা বিক্রেতা— প্রতিটি পর্যায়ে লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রবিধানমালা থাকতে হবে। যারা সরকারের নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা ও অঙ্গীকার রাখবে, তাদের লাইসেন্সই নবায়ন কেবল হবে। লাইসেন্সিদের তালিকাও প্রতি বছর নবায়ন হতে হবে। সে তালিকায় নতুন নতুন দেশি-বিদেশি লাইসেন্সিও যুক্ত হবে। আর যেসব লাইসেন্সি আইন ও বিধি-বিধান ভঙ্গ করবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এছাড়া বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতা কমিশনকেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অভিযোগ উঠেছে, এলপিজির বাজারে কতিপয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত। সেটি তাকে অবশ্যই ভাঙতে হবে।
আমার মতে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিইআরসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও প্রতিযোগিতা কমিশনের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি এবং প্রচলিত আইনে মামলা করতে হবে। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয় নয়, ভোক্তাস্বার্থ ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তথা জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা সংকট মোকাবিলার বিষয়।
জাতীয় অর্থনীতি: নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
এম শামসুল আলম: তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সরকারও তাদের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারছে না। ফলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগে সরকারের সক্ষমতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
জাতীয় অর্থনীতি: তাহলে কি বলা যায়, এলপিজি বাজার ব্যবসায়ীদের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে সরকার?
এম শামসুল আলম: আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের দায়িত্ব সরকারের। সরকারকে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে জনগণকে সুরক্ষা দিতে হবে। কিন্তু কোনো একটি খাতে ব্যবসায়ীরা যদি নিজেদের মতো করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারেন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
এলপিজি বাজারে বর্তমানে আমরা সেই পরিস্থিতিই দেখতে পাচ্ছি। জ্বালানি প্রশাসনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিতর্কিত ভূমিকা ব্যবসায়ীদের আইন ও নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে জবাবদিহির পরিবর্তে সুরক্ষা দিচ্ছে।
এতে শুধু ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সরকারের ওপর থেকেও মানুষের আস্থা কমছে। এ দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি আদর্শ ও সভ্য রাষ্ট্রে এ ধরনের পরিস্থিতির প্রতিকার হওয়াই স্বাভাবিক। আইনের প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষা— এগুলোই সুশাসনের মানদণ্ড। সেই মানদণ্ড জ্বালানি প্রশাসনে অনুপস্থিত, তা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
