বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। এ উত্তরণ দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন মর্যাদার বিষয়, তেমনি নতুন প্রতিযোগিতা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জেরও সূচনা। আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা, রপ্তানি প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ ক্রমে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিকল্প নেই। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনে পরিকল্পনা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তার কার্যকর বাস্তবায়ন। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এনএসইজেড) বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রায় ৩৩ হাজার একর জমিতে গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অথচ প্রায় এক দশক পেরিয়ে বর্তমানে মাত্র ১৭টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে, নির্মাণাধীন ২৪টি এবং কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। অর্থাৎ বিপুল সম্ভাবনা ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। এ ব্যবধান শুধু একটি প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও প্রতিফলন।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে রয়েছে জমি হস্তান্তরে বিলম্ব এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অনিশ্চিত সরবরাহ। পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ, শ্রমিক আবাসন, পরিবহন, ব্যাংকিং ও অন্যান্য সহায়ক সেবার ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বেজা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বরাদ্দ পাওয়া জমি দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া, শিল্প-উপযোগী সড়ক নির্মাণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি।
একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে কার্যকর করতে হবে। পরিবেশ ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, ব্যবসায়িক অনুমোদন ও অন্যান্য লাইসেন্সের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা প্রদান নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও দীর্ঘসূত্রতা উভয়ই কমবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির সুরক্ষা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিল্পায়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য। অথচ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। তাই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার আধুনিকায়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। মিরসরাইয়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র, শ্রমিকদের নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা, পরিবহন ও বিনোদন সুবিধা গড়ে তোলাও জরুরি। এতে দক্ষ শ্রমিক আকৃষ্ট ও ধরে রাখা সহজ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশগত ভারসাম্য। সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ এলাকা উচ্ছেদ করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পর পরিবেশের ক্ষতি প্রশমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য শোধনাগার, জলাভূমি সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না হলে টেকসই শিল্পায়নের লক্ষ্য ব্যাহত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে পরিবেশ সুরক্ষাকে শিল্পায়নের প্রতিপক্ষ নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আমরা মনে করি, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কার্যকর শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করতে সরকারকে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তব বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এলডিসি উত্তরণ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তথা যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আর গতানুগতিক শিল্পায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব ও রপ্তানিমুখী শিল্পব্যবস্থা। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল হতে পারে সেই রূপান্তরের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিপুল জমি, বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকে কাজে লাগাতে এখনই সমন্বিত ও সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাফল্য জমির আয়তন কিংবা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিতে নয়; বরং সেখানে কত দ্রুত শিল্প গড়ে উঠছে, উৎপাদন বাড়ছে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে— তার ওপরই নির্ভর করবে। তাই সরকার পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়ন, প্রতিশ্রুতির চেয়ে অর্জন এবং আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে কার্যকর উদ্যোগকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলেই প্রত্যাশা।
