ড্যাপ সংশোধনে জনস্বার্থ উপেক্ষার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার তিনটি প্লটের ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি পরিবর্তন করে ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ এবং পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পে ভবনের অনুমোদিত আয়তন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের অভিযোগ, ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) সাম্প্রতিক সংশোধন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে করা হয়েছে। এতে রাজধানীর উন্মুক্ত স্থান, জলাধার ও বন্যার পানি প্রবাহের এলাকা সুরক্ষার পরিকল্পনা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় সংশোধনগুলো পুনর্বিবেচনা এবং স্বাধীন পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া গঠিত কারিগরি কমিটি বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) উদ্যোগে রাজধানীর বাংলামোটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি সম্মেলন কক্ষে ‘পরিকল্পনা না মানলে বাসযোগ্য ঢাকা নয়: ড্যাপ সংশোধনী পুনর্বিবেচনা ও স্বাধীন পেশাজীবীবিহীন কারিগরি কমিটি বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে নগর পরিকল্পনাবিদরা এসব উদ্বেগের কথা জানান। ড্যাপের সাম্প্রতিক সংশোধনী পুনর্বিবেচনা এবং স্বাধীন পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ববিহীন কারিগরি কমিটি বাতিলের দাবিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিআইপি সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক এবং সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদসহ আরও অনেকে। 


অনুষ্ঠানে বলা হয়, গত ১৪ অক্টোবর ড্যাপের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশোধন এনে প্রজ্ঞাপন জারি করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী শ্যামপুর-কদমতলী এলাকার তিনটি প্লটের ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি ‘উন্মুক্ত স্থান’ থেকে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ করা, পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বাড়ানোর সুযোগ এবং প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহার ও জলপ্রবাহ ওভারলে জোনের নির্দেশনার মধ্যে বিরোধ নিরসনে নতুন বিধান যুক্ত করা।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুসরণ ছাড়া কোনো শহর বাসযোগ্য হতে পারে না। ঢাকা এর ব্যতিক্রম নয়।’ তিনি বলেন, ড্যাপ সংশোধনের জন্য গঠিত ৯ সদস্যের কারিগরি কমিটিতে শুধু সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন। সেখানে পেশাজীবী সংগঠন, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ কিংবা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের রাখা হয়নি। অথচ এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর প্রভাব, নগরের বাসযোগ্যতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি। ড. আরিফুল ইসলামের আশঙ্কা, ঘনবসতিপূর্ণ ও দূষণপ্রবণ শ্যামপুর-কদমতলী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ এবং পূর্বাচল ও ঝিলমিলে ভবনের আয়তন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে নগর পরিবেশ ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াবে। 

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুছলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, ২০২৩ সালে ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর একাধিক পর্যায়ের পর্যালোচনা ও সংশোধনের মাধ্যমে পরিকল্পনাটি একটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছিল। কিন্তু ১৪ অক্টোবরের গেজেটে বেশ কিছু আকস্মিক ও অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকার পরিবর্তনগুলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে করা হয়েছে বলে বিআইপি মনে করে।

মুছলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অথচ এলাকাটিতে আগে থেকেই খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের সংকট রয়েছে। পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ও অনিয়ম দূর করা না গেলে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নগর পরিকল্পনার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘পরিকল্পনা ফ্যাসিবাদ’ বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠী জনস্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি সমর্থন ও বৈধতার সুযোগ নিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আখতার মাহমুদ বলেন, ড্যাপ সংশোধনের জন্য গঠিত ৯ সদস্যের কমিটিতে পেশাদার পরিকল্পনাবিদ কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব নেই। কমিটিতে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে। এ ধরনের কমিটি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে। 
সংবাদ সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বিআইপির পক্ষে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবহার ও ভারী শিল্প স্থাপনসংক্রান্ত সংশোধন পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর না করা। বর্তমান কারিগরি কমিটি বিলুপ্ত করে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্বাধীন পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিটি গঠন এবং সংশোধনী প্রণয়ন ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। এছাড়া উন্মুক্ত স্থানে ভারী শিল্প স্থাপনের ফলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, নগরের বাসযোগ্যতা, ভূমি ব্যবহারের ভারসাম্য ও নাগরিক সুবিধার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং উন্মুক্ত স্থানের সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা প্রণয়ন।