এ কে এম ফজলুর রহমান: ম্যানিলার পথে পথে কয়েকদিন বেড়ানোর পর আমার মনে হচ্ছে— একটি দেশের উন্নয়ন কেবল তার জিডিপি, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু কিংবা সুউচ্চ অট্টালিকা দিয়ে বোঝার চেষ্টা একটা সরল প্রবণতা মাত্র। কিন্তু উন্নয়ন তথা সামাজিক মান বুঝতে হলে তার রাস্তা, ফুটপাত, ট্রাফিক, পরিচ্ছন্নতা, জনপরিসরে মানুষের আচরণ দেখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন নাগরিক জীবনে কতটা কার্যকর।
ফিলিপাইনের ইতিহাস খুব সরল নয়। প্রায় ৩৩৩ বছরের স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের পর আসে ৪২ বছরের মার্কিন শাসন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানি দখলদারিত্বের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় দেশটি। ১৮৯৮ সালের ১২ জুন স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিপাইনের স্বাধীনতা স্বীকার করে ১৯৪৬ সালের ৪ জুলাই।
স্বাধীনতার পরেও দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল টালমাটাল। ফার্দিনান্দ মার্কোস সিনিয়রের দীর্ঘ শাসন, মার্শাল ল, বিরোধী রাজনীতি দমন, দুর্নীতির অভিযোগ ও শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালের ফিলিপাইনের গণশক্তি বিপ্লব সবই আজও ফিলিপাইনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অংশ। মার্কোস পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। ইমেলদা মার্কোসের বিপুলসংখ্যক জুতার সংগ্রহ পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি ও বিলাসিতার প্রতীকে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পার করা এদেশে কয়েকদিন রাজধানী ম্যানিলা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘুরে কিছু বিষয় চোখে পড়ে, যা একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ভাবায়। যেমন-
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা: ম্যানিলাতেও যানজট আছে, কখনও যথেষ্টই আছে। ট্রাফিক ভল্যুম আমাদের ঢাকার মতোই। কিন্তু জ্যামের মধ্যেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সক্রিয় বলে মনে হয়। নির্ধারিত লেন মেনে চলা, ট্রাফিক সংকেত, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মী বা ট্রাফিক পুলিশ এবং সড়ক ব্যবহারের নিয়ম-কানুন তুলনামূলকভাবে অনেক কার্যকর। শহর বড়, গাড়ি অনেক, মানুষের তাড়াও আছে— তবু একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-কানুন কাজ করছে বলে অনুভূত হয়।
পরিচ্ছন্নতা: মেট্রো ম্যানিলা নিখুঁত পরিচ্ছন্ন শহর নয়, কিন্তু জনপরিসর ব্যবস্থাপনার প্রতি একটি দৃশ্যমান গুরুত্ব আছে। মেট্রো ম্যানিলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্যই হলো একটি ‘পরিচ্ছন্ন ও ময়লামুক্ত মেট্রো ম্যানিলা’ তৈরি করা। জনগণও সাড়া দিচ্ছে। তাই ম্যানিলা শহর যথেষ্ট পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন।
প্রকাশ্য ধূমপান নিয়ন্ত্রণ: আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে— প্রকাশ্যে ধূমপানের নিয়ন্ত্রণ। ফিলিপাইনে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রকাশ্য জনসমাগমস্থল ও আবদ্ধ স্থানে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট নীতি রয়েছে। সেখানকার স্বাস্থ্য বিভাগ এটিকে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ ফ্রেমওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যান্ডেট হিসেবে বাস্তবায়ন করছে। ম্যানিলা এখানে সফল। এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিচ্ছন্নতা কেবল সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। এটি নাগরিক অভ্যাসও। রাস্তার পাশে ময়লা ফেলা, যেখানে সেখানে থুতু ফেলা, ফুটপাত দখল করা, ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করা— এসব যখন সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র একা শহরকে সুন্দর রাখতে পারে না। আমাদের রাজধানী ঢাকার দিকে তাকাই!
ম্যানিলায় মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে একটি গোছানো ও পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস চোখে পড়ে। এটি হয়তো সামাজিক সংস্কৃতির উন্নয়ন, জনসচেতনামূলক শিক্ষা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও দীর্ঘদিনের সুনাগরিক আচরণ চর্চা সব কিছুর সম্মিলিত ফল। আইন থাকলেই অবশ্য সবকিছু হয় না। বাংলাদেশেও বহু ভালো আইন আছে। মূল প্রশ্ন হলো আইন কতটা দৃশ্যমানভাবে প্রয়োগ হয় ও নাগরিক কতটা স্বেচ্ছায় বা অভ্যাসগতভাবে তা মানে। এই জায়গাতেই ‘সুশাসন’ কথাটির একটি বাস্তব অর্থ পাওয়া যায়। আমরা সুশাসনকে প্রায়ই বড় বড় শব্দে ব্যাখ্যা করি— স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কত কিছু! কিন্তু সাধারণ নাগরিকের কাছে সুশাসনের সবচেয়ে বাস্তব রূপ হতে পারে আরও সহজ। যেমন: রাস্তা পরিষ্কার কি না, সিগন্যাল মানা হয় কি না, ধূমপান নিষিদ্ধ জায়গায় সত্যিই ধূমপান বন্ধ কি না, ফুটপাত দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারে কি না, নিয়ম ভাঙলে তার প্রতিকার আছে কি না।
এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই আসলে রাষ্ট্রের বড় সক্ষমতার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মোট অর্থনীতির আকার খুব বেশি দূরে নয়। বিশ্ব ব্যাংকের ২০২৫ সালের হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপি ৪৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। আর ফিলিপাইনের জিডিপি ৪৮৭ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ জিডিপি’র মোট আকার দিয়ে দেখলে দুই দেশকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মনে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু শহরের অভিজ্ঞতায় পার্থক্য কেন? আমার মনে হয় এর উত্তর শুধু অর্থনীতিতে নেই; আছে প্রতিষ্ঠান, সুশাসন এবং মানুষের আচরণে। একটি রাষ্ট্র হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এক্সপ্রেসওয়ে বানাতে পারে। বিশাল শপিংমল তৈরি হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। আধুনিক বিমান বন্দর, মেট্রোরেল, সেতু সবই হতে পারে। কিন্তু সেই অবকাঠামো ব্যবহারকারী মানুষ যদি নিয়ম না মানে, যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে না করে, যদি নাগরিক শৃঙ্খলা না থাকে— তাহলে উন্নয়নের সৌন্দর্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
অন্যভাবে বললে, অবকাঠামোতে গড়ে ওঠে শহর আর নাগরিকের আচরণে গড়ে ওঠে সভ্যতা। এই উপলব্ধিই ম্যানিলা ভ্রমণ যে কারও কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে। উন্নয়নকে আমরা অনেক সময় কংক্রিট, স্টিল ও গ্লাস দিয়ে মাপি। কিন্তু উন্নয়নের আরেকটি অদৃশ্য অবকাঠামো আছে— মানুষের অভ্যাস, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। এই অবকাঠামো তৈরি করা অনেক কঠিন। একটি সেতু পাঁচ বছরে তৈরি করা যায়; কিন্তু একটি সমাজে সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে হয় বহু বছর ধরে। একটি শপিংমল দু-তিন বছরে দাঁড়িয়ে যেতে পারে; কিন্তু নাগরিককে জনপরিসর পরিচ্ছন্ন রাখতে শেখানো যায় না শুধু একটি প্রকল্প দিয়ে। সেখানেই আসে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। মানবসম্পদ উন্নয়ন মানে শুধু বৃত্তিমূলক দক্ষতা নয়। শুধু কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নয়। এর মধ্যে নাগরিক শিক্ষাও থাকতে হবে।
মানুষকে শেখাতে হবে— অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা, আইনকে শুধু ভয় নয় সামাজিক নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করা, সময় মানা, পরিচ্ছন্ন থাকা, ভিড় বা সারি মানা, সড়ক ব্যবহারবিধি মেনে চলা ইত্যদি।
এগুলো অর্থনীতির টেক্সবুকে জিডিপি বাড়ায় না, কিন্তু বাস্তব জীবনে একটি দেশের উৎপাদন, বসবাস উপযোগিতা এবং সামাজিক আস্থা বাড়ায়। ম্যানিলা তাই আমাকে বড় বড় ভবন, শপিংমল, পাঁচ তারকা হোটেলের চেয়ে বেশি ভাবিয়েছে মানুষের আচরণ নিয়ে। ফিলিপাইনও দুর্নীতিমুক্ত নয়, রাজনৈতিক Dynasty-মুক্ত নয়, দারিদ্র্যমুক্তও নয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের হিসাবে ফিলিপাইনের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে কিছু বেশি হলেও দেশটিতে বৈষম্য, অনানুষ্ঠানিক বসতি এবং সামাজিক অসমতা এখনও বাস্তব সমস্যা। তবু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন— কিছু মৌলিক নগর আচরণবিধি এবং জনব্যবস্থাপনা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে তুলনামূলকভাবে সংগঠিত করেছে।
এ থেকে বাংলাদেশের জন্য আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি খুব সাধারণ: উন্নয়নের জন্য অর্থ দরকার, অবকাঠামো দরকার, বিনিয়োগ দরকার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উন্নয়নকে টেকসই ও দৃশ্যমান করে মানুষ। মানুষ যদি উন্নত না হয়, অবকাঠামো একসময় জীর্ণ হয়। প্রতিষ্ঠান যদি শক্তিশালী না হয়, আইন কাগজেই থেকে যায়। নাগরিক আচরণ যদি পরিবর্তিত না হয়, শহর বড় হয় কিন্তু সভ্য হয় না। ম্যানিলার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তাই বারবার মনে হয়েছে— আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী বড় প্রকল্প হয়তো আরেকটি ফ্লাইওভার কিংবা এমআরটি নয়, আরেকটি টানেলও নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হওয়া উচিত মানুষ গড়া।
যুগ্ম সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
(৫-১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ম্যানিলায় অবস্থানকালে সরেজমিন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নিবন্ধটি রচিত)
