বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ

ক্রীড়া প্রতিবেদক: টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দল সম্প্রতি ইতিবাচক ও সাহসিকতার বার্তা দিচ্ছিল। দেশের ভেতরে হোক কিংবা ভিনদেশের অপরিচিত পিচে— সবুজ ঘাস কিংবা বাউন্সি উইকেটে ব্যাট ও বলের সত্যিকারের লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। চলতি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে টাইগারদের চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স সেই আশার পালে হাওয়া দিয়েছিল, প্রথমবারের মতো কোনো বৈশ্বিক টেস্ট টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার সমীকরণ মেলানো সম্ভব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হোম সিরিজটি ছিল সেই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় সিঁড়ি। কিন্তু মিরপুরের চেনা অথচ আত্মঘাতী স্পিন ট্র্যাকে ৮ উইকেটের বড় হার সেই স্বপ্নে এক নিমেষে জল ঢেলে দিল।

মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বরাবরই স্পিন উইকেটের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বৃহত্তর মঞ্চে নিজেদের স্পোর্টিং পিচ কালচার থেকে সরে এসে হুট করে টার্নিং ট্র্যাক বানানোর খেসারত দিতে হলো দলটিকে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ যখন ৩ উইকেটে ২১৩ রানের শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে, তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি পুরোপুরি স্বাগতিকদের মুঠোয়। ওপেনার সাদমান ইসলামের অবিস্মরণীয় ১০৫ রানের ইনিংসটি দলকে চালকের আসনে বসিয়েছিল। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আত্মাহুতির মিছিল। সাদমানের বিদায়ের পর মাত্র ৫৯ রান যোগ করতেই বাকি ৭ উইকেট হারিয়ে ধসে পড়ে বাংলাদেশ। ইনিংস শেষ হয় মাত্র ২৭২ রানে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের প্রথম ইনিংসে ২৪৫ রানে গুটিয়ে গেলে বাংলাদেশ পায় ২৭ রানের অতিমূল্যবান লিড। নাঈম হাসান ৩৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে চমৎকার বোলিং করলেও সেই সুফল ধরে রাখা যায়নি। ক্যারিবীয় স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান প্রথম ইনিংসে একাই ৫ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের বড় সংগ্রহ গড়তে দেননি।

ম্যাচের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে। ক্যারিবীয় বোলারদের ঘূর্ণি জাদু আর ব্যাটসম্যানদের চরম দায়িত্বহীনতায় মাত্র ৩৫ রান তুলতেই সাজঘরে ফিরে যান টপ অর্ডারের ৫ ব্যাটার! স্কোরবোর্ডে ৮৪ রান উঠতে না উঠতেই পতন ঘটে ৭ উইকেটের। শেষ দিকে নাঈম হাসানের লড়াকু ৫২ রানের সুবাদে কোনোমতে দলীয় সংগ্রহ ১৪২ পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব হয়। সফরকারী অধিনায়ক রোস্টন চেজ মাত্র ৩৬ রানে ৫ উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের ইনিংসে ধস নামান।

১৭০ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ক্যারিবীয় ওপেনার জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং অনায়াসে প্রথম উইকেটে ১১২ রান তুলে ফেলেন। ব্র্যান্ডন কিংয়ের অপরাজিত ৮১ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে দেয়। মিরপুরের চেনা উইকেটে নিজেদের স্পিনাররাই যেখানে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে ক্যারিবীয় স্পিনাররা রাজত্ব করে ম্যাচ জিতে নিয়েছেন।

এই টেস্টে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল মিডল অর্ডার ব্যাটার তাওহীদ হৃদয়ের পারফরম্যান্স ও শট নির্বাচন। মুশফিকুর প্রথম সারির অভিজ্ঞ ব্যাটার না থাকায় হৃদয়ের ওপর বাড়তি দায়িত্ব ছিল ইনিংস মেরামতের। কিন্তু প্রথম ইনিংসে ৪২ রান করার পথে দৃষ্টকটু শট খেলার পর, দ্বিতীয় ইনিংসে চরম চাপের মুখে মাঠে নেমেই মাত্র দুই বল খেলে বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে আসেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধৈর্যের বড় অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে তার শটগুলোতে।
সঙ্গে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমের অনুপস্থিতি এবং ফিল্ডিংয়ের সময় মাথায় আঘাত পেয়ে কনকাশন হয়ে মুমিনুল হকের ছিটকে যাওয়া দলের ব্যাটিং মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিয়েছিল। মিডল অর্ডারে এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ছায়া না থাকায় তরুণরা চাপের মুখে ভেঙে পড়েছেন।

স্পোর্টিং উইকেটে খেলার সাহসী ধারা থেকে সরে এসে মিরপুরের স্পিন ফাঁদে পা দেওয়ার এই সংস্কৃতি দেশের টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির পথে বড় বাধা। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার যে সোনালি স্বপ্ন বাংলাদেশ বুনছিল, মিরপুরের এই বিপর্যয়কর হার তাকে অনেক দূরে ঠেলে দিল। এখন ফাইনালে যাওয়ার সমীকরণ মেলাতে হলে ক্রিকেট বোর্ডের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে— নতুবা ঘরের চেনা পিচই বারবার কাল হয়ে দাঁড়াবে টাইগারদের জন্য।     
                                                                                        
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ২৭২ ও ১৪২ (নাঈম ৫২, জাকের ২২; চেজ ৫/৩৬, ওয়ারিকান ৪/৬৩)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ২৪৫ ও ১৭০/২ (কিং ৮১*, ক্যাম্পবেল ৪৯; হাসান ১/১৪)।
ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে।