মোহাম্মদ শাহজাহান, খাগড়াছড়ি: পাহাড়, ঝরনা, লেক, চা-বাগান, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক ও বৈচিত্র্যময় জনপদ— প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনা রয়েছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। অথচ সাজেকের বাইরে জেলার অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে আশানুরূপ পর্যটকের দেখা মিলছে না। পর্যটক কমে যাওয়ায় হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। এতে আর্থিক সংকটে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীরা।
পর্যটকদের বড় একটি অংশের কাছে খাগড়াছড়ি মানেই সাজেক ভ্যালি। অথচ সাজেকের বাইরেও জেলাজুড়ে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। আলুটিলা, রামগড় চা-বাগান, মায়াবিনী লেক, হাতির মাথা সিঁড়ি, মহালছড়ি ও সীমান্ত সড়ক হতে পারে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাজেক সড়কে অবরোধ ও যোগাযোগের অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে জেলার সামগ্রিক পর্যটন খাতে। সাজেক ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করা পর্যটকদের অন্য কেন্দ্রগুলোতে আকৃষ্ট করার কার্যকর উদ্যোগও নেই।
অথচ পরিকল্পিতভাবে ভ্রমণ করলে খাগড়াছড়িতে অনায়াসেই দুই দিন কাটানো সম্ভব। খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে আলুটিলা পাহাড় ও গুহা অন্যতম আকর্ষণ। পাহাড়ের ওপর থেকে সবুজ প্রকৃতি, দূরের পাহাড়ের সারি ও মেঘের আনাগোনা মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
অন্যদিকে বিকাল কাটানোর জন্য রয়েছে রামগড় চা-বাগান। সারি সারি চা-গাছ, পাহাড়ের ঢাল ও বিকালের সোনালি আলো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন নিদর্শন ও রামগড় স্থলবন্দরও রয়েছে এ এলাকায়।
অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য আকর্ষণ হতে পারে পাহাড়ের বুক চিরে চলে যাওয়া সীমান্ত সড়ক। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ও দুই পাশের সবুজ প্রকৃতি ভ্রমণপিপাসুদের ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। তবে সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ও প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য রয়েছে পাহাড়ঘেরা মায়াবিনী লেক। আর ট্রেকিংপ্রেমীদের আকর্ষণ হতে পারে দুর্গম পাহাড়ি পথের হাতির মাথা সিঁড়ি। মহালছড়িতে কাপ্তাই হ্রদের বিস্তৃত জলরাশিও পর্যটকদের মুগ্ধ করতে পারে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি খাগড়াছড়ির হাটবাজার ও স্থানীয় সংস্কৃতিও পর্যটনের বড় সম্পদ। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনযাত্রা, পাহাড়ে উৎপাদিত তাজা শাকসবজি, ফলমূল ও স্থানীয় হস্তশিল্প পর্যটকদের নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এছাড়া বাঁশে রান্নাকরা খাবার, পাহাড়ি মুরগি, বিভিন্ন শাকসবজি ও স্থানীয় ফলমূলের স্বাদও ভ্রমণের বাড়তি আকর্ষণ।
তবে এসব সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকের অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার পর্যটন খাত। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা কোকনাথ ত্রিপুরা বলেন, আগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি পর্যটক আসতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ১০০ থেকে ২০০ জনে দাঁড়িয়েছে। তাদের অধিকাংশই স্থানীয় পর্যটক। পর্যটক কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজি ভেঙে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।
জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কেও একই পরিস্থিতি। পার্কের টিকিট পরীক্ষক মো. আরিফ বলেন, জেলার বাইরের পর্যটক এখন আসছেন না বললেই চলে। পার্কের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুলন্ত সেতু, প্যাডেল বোট ও নতুন রাইড যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পর্যটক না থাকায় এসব সুবিধার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যটক কমে যাওয়ায় আবাসন ও পরিবহন খাতেও দেখা দিয়েছে মন্দা। খাগড়াছড়ি শহরের অরণ্য বিলাস হোটেলের ব্যবস্থাপক মো. সাগর জানান, সাজেক সড়কে অবরোধ শুরুর পর থেকেই হোটেলের বুকিং কমতে থাকে। বর্তমানে বুকিং প্রায় শূন্যের কোঠায়।
খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক ক্যাচিং মারমা বলেন, জেলার পর্যটন খাতের ওপর নির্ভর করে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। পর্যটক কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অনেকেই বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুশ চাকমা জানান, খাগড়াছড়িতে জিপ, সাফারি গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০টি যানবাহন পর্যটনকেন্দ্রিক চলাচল করে। এসব যানবাহনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অন্তত ১ হাজার মানুষ। পর্যটক না থাকায় চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, খাগড়াছড়িকে সাজেকনির্ভর পর্যটন ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে সমন্বিত প্রচার, দুই দিনের ভ্রমণ প্যাকেজ চালু, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যাপ্ত আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পাহাড়ি হাটবাজারকে পর্যটনের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও যথাযথ প্রচার নিশ্চিত করা গেলে সাজেকের বাইরেও খাগড়াছড়ি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য।