নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ঢাকার পূর্বাচলে পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে অভিযান ঘিরে আলোচনায় এসেছে মাদক আড্ডায় করপোরেট জগতের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি। এশিয়াটিক, গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি), প্রাণ-আরএফএলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সেখানে উপস্থিত থাকার তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে পুলিশ।
গত ১৯ অক্টোবর অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন বাড়িটিতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে ৮৫ জনকে আটক করা হয়। যার মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। আটক ৮৫ জনকে মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়া হয়। পুরুষদের এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নারীদের সাজা হয় ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন দিনের কারাদণ্ড। তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৬ জনকে কাশিমপুরে এবং বাকিদের কেরানীগঞ্জে পাঠানো হয়েছে।
খিলক্ষেত থানার ওসি আব্দুল আলীম বলেন, আসামিদের থানায় হস্তান্তর না করে সরাসরি ডিবির তত্ত্বাবধানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা ও জরিমানা দেওয়া হয়। তবে সাজাপ্রাপ্তদের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তাদের অনেকে ভুল ঠিকানা, পেশা কিংবা ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত নারীদের মধ্যে রয়েছেন এশিয়াটিকের কনটেন্ট ক্রিয়েটর আফসানা বুলবুল, সামজানা মেহজাবীন এবং এশিয়াটিকে কর্মরত ফ্রিল্যান্সার ওয়াফা; সিটি ব্যাংকের অ্যাসোসিয়েট ম্যানেজার নিশাত সাল সাবিল মিম; ইয়ামাহা মোটরের প্রোডাক্ট এক্সিকিউটিভ নাছরিন সুলতানা; ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের কনসালট্যান্ট ও গ্রামীণফোনে কর্মরত সায়মা এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মালিহা।
পুরুষদের মধ্যে রয়েছেন সেলিস এইচআরের ইন্টার্ন সাদমান সাকিব, ইটিআই বাংলাদেশের কর্মকর্তা সাদমান বিন আহসান, ফিলিপ মরিসের ম্যানেজার তাওহিদ, মারভেলের কমিউনিকেশন লিড মো. সাদাত, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ব্যবসায়ী জিফান তাহমিদ, ইস্ট ওয়েস্ট ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের কর্মকর্তা ফারাহিম ফাইয়াজ, গোল্ডেন সানরাইজের ম্যানেজার মাহবুবুল আলম, প্রাণ-আরএফএলের ব্র্যান্ড ম্যানেজার রাকিবুল ইসলাম তানজিম, ইনভিজিবল টেকের ডেটা অ্যানালিস্ট মাফি মুস্তাফা, এশিয়াটিক মিডিয়া লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার তানজির আহমেদ, এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ারের স্ট্র্যাটেজিক কর্মকর্তা সাজিদ মাহমুদ, বসুন্ধরার সাজ্জাদুল আলম সেজান, এমআইএসটির শিক্ষার্থী ও গবেষণা বিশ্লেষক ফয়সাল আহমেদ, প্রাইমটেক্সের সিনিয়র ভেন্ডর ম্যানেজার আফতাবুল মাওলা রাব্বি এবং এশিয়াটিকের কমনিওর কোম্পানিতে এসডিআর পদে কর্মরত কাজী তাহমিদ ইসলাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযানের সময় অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন উচ্চপদস্থ ও পরিচিত ব্যক্তি স্থান ত্যাগ করে গা-ঢাকা দেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। বাড়িটিতে বার পরিচালনার অনুমতি না থাকার বিষয়টি বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মাইন্ডশেয়ার, এএমএল ও কমিউনিকেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২০ কর্মকর্তা ওই আয়োজনে অংশ নেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের প্রতিষ্ঠিত এশিয়াটিক গ্রুপের এই আয়োজনে অন্য কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সারও রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এশিয়াটিক গ্রুপের হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ করতেন বলে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই আয়োজনের সঙ্গে সম্প্রতি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরার যোগসূত্র থাকতে পারে। গত ১২ অক্টোবর পল্লবী ও বনানী থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও নিষিদ্ধ সংগঠনের তহবিলের তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনও জানা যায়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর নির্মিত তিনতলা বাড়িটি এয়ারবিএনবি অ্যাপের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। বাড়িটি পরিচালনায় মাহবুব আলমকে কো-হোস্ট নিয়োগ করেছিলেন জহির। ভাড়ার ৭০ শতাংশ জহিরের অ্যাকাউন্টে এবং ৩০ শতাংশ মাহবুবের কাছে যেত। পাঁচ কক্ষের বাড়িতে প্রতিটি কক্ষে সর্বোচ্চ ১০ জন ভাড়া নিতে পারতেন। অতিরিক্ত ব্যক্তির জন্য জনপ্রতি ৬০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হতো। দুপুর ১২টা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলা এসব আয়োজনে মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২০টি অনুষ্ঠান হতো। প্রতিটি অনুষ্ঠান থেকে লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হতো বলে জানা গেছে। বাড়িটি পুলিশের এক কর্মকর্তার হওয়ায় স্থানীয়ভাবে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পেতেন না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। বাড়ি কেনার অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডিবি উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, বাড়িটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টির নামে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের আসর বসত। সেখানে মদ ও মাদক সেবনসহ নানা কর্মকাণ্ড চলত। তল্লাশিতে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও যৌন সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এসব পার্টির মাধ্যমে দেবাশীষ ও গুলশান আরা গং তাদের নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে লোক সংগ্রহ করতেন।
নতুন এ ঘটনায় অতীতের মাদককাণ্ড সামনে আসায় বিশেষ করে সমালোচনায় পড়েছে এশিয়াটিক গ্রুপ। এশিয়াটিকের বিরুদ্ধে করপোরেট কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের নিয়ে মদ ও মাদকের আসর আয়োজনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২১ সালে সারা রিসোর্টে এশিয়াটিকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ফরথোট পিআর ও ব্ল্যাকবোর্ডের আয়োজিত রাতের পার্টিতে বিষাক্ত মদপানে চারজনের মৃত্যু হয়। কয়েকজন দৃষ্টিশক্তিও হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ফরথোট পিআরের মীর কায়সার ও শিহাব জহির এবং ব্ল্যাকবোর্ডের শরিফুজ্জামান ভূঁইয়া। ওই ঘটনার তদন্ত ও তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পূর্বাচলের নতুন ঘটনায় ২০২১ সালের ঘটনাটিও আবার আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
এদিকে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরতরা এমন কাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়ায় অফিসিয়ালি কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা নিয়ে কথা বলতে চাননি কোনো প্রতিষ্ঠানই। এশিয়াটিক এমসিএল ও এশিয়াটিক থ্রি সিক্সটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরেশ যাকেরকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে গ্রুপটির এক কর্মকর্তা আইনি বিষয় নিয়ে ‘আপাতত’ কথা বলতে চান না বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী, প্রাণ আরএফএলের কমিউনিকেশন ম্যানেজার কামরুজ্জামান চৌধুরীকে ফোনে পাওয়া যায়নি। বিএটির হেড অব এক্সটার্নাল এনগেজমেন্ট তৌহিদ আহমেদ জানান, গ্রেপ্তার হওয়া কর্মীর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কী, তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে তিনি যোগাযোগ বিভাগের একটি নম্বর দেন। তবে ওই নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
