সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র বাতিল হওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত ছয় মাসে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রিতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এতে নিজস্ব অর্থায়নে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা কমেছে সংস্থাটির।
এর মধ্যে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের চলমান আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়াতে ২০১২ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেয় বিপিসি। দীর্ঘদিন প্রকল্পটির তেমন অগ্রগতি ছিল না। সম্প্রতি কার্যক্রমে গতি এলেও পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র বাতিল হওয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নতুন করে পরামর্শক নিয়োগের নির্দেশ
১৯ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে চলমান পরামর্শক নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিলের নির্দেশ দেয় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। বিভাগের পরিকল্পনা-৪ শাখার উপসচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আরও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণ করে নতুন করে আগ্রহপত্র আহ্বান করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক বা পিএমসি নিয়োগের বিদ্যমান কার্যপরিধি পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরামর্শক নিয়োগের জন্য আগ্রহী পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তাদের দাবি, পিপিআর, ২০২৫ অনুসরণ করে বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো বাছাই করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক আসমা আর বেগম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পরামর্শক নিয়োগের চলমান আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। প্রকল্পের বাকি কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
লোকসানে কমেছে অর্থায়নের সক্ষমতা
বিপিসির অর্থ বিভাগের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংস্থাটির পুঞ্জীভূত মুনাফা ছিল ৩৫ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে আমদানি ব্যয়ের চেয়ে কম দামে সরবরাহ করায় গত ছয় মাসে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
ওই সূত্রের দাবি, বিপিসির ব্যাংকে জমা অর্থও কমেছে। বর্তমানে ব্যয়যোগ্য তহবিল রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে নিয়মিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে হবে। ফলে নিজস্ব অর্থায়নে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির একজন মহাব্যবস্থাপক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, গত ছয় মাসের লোকসানের কারণে সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা কমেছে। এখন নিজস্ব অর্থে বড় বিনিয়োগের প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই।
জ্বালানি আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ জানান এই কর্মকর্তা। তার আশঙ্কা, এতে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের ব্যয় বাড়তে পারে এবং জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এ খাতে সরকারের বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ব্যয় ও অর্থায়ন
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার। এটি বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টন বাড়াতে ২০১২ সালে ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্প নেওয়া হয়।
শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। পরে ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ নামে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৩ হাজার ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর দুই দফা কাটছাঁট করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ সরকারি ঋণ এবং বাকি ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় থেকে বহন করার কথা। বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় সংস্থাটির অংশের অর্থ জোগান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
