দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার

প্রযুক্তি ডেস্ক: অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, ঠিক সেভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা বদলে দিচ্ছে এই প্রযুক্তি। সম্প্রতি গুগল, টেমাসেক এবং বেইন অ্যান্ড কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘ই-কমি এএসইএ ২০২৬’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরেরও কম সময়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রধান ছয়টি দেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৪ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান ওই অঞ্চলগুলোর মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ৫৮ শতাংশের সমান। প্রযুক্তি খাতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের কাছে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছাতে যেখানে এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল, সেখানে এআই প্রযুক্তি মাত্র তিন বছরের মধ্যে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছানোর ক্ষমতার চেয়ে চারগুণ দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এআই।

তবে এই বিপুল পরিমাণ ব্যবহারকারী থাকা সত্ত্বেও সরাসরি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্থের বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার হার এখনও অনেকটাই কম। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এআই অ্যাপ বা টুল ব্যবহারের জন্য মাসিক বা বার্ষিক ফি পরিশোধ করেন। তবে এই খাতের প্রকৃত বাণিজ্যিক মুনাফা সাধারণ গ্রাহকদের পকেটের ওপর নির্ভর করছে না, বরং তা অর্জিত হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রচারণার মাধ্যমে।

বেইন অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার ফ্লোরিয়ান হপ জানান, সাধারণ মানুষ সরাসরি টাকা দিয়ে এআই ব্যবহার না করলেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন উপায়ে এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ই-কমার্স, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন এবং গ্রাহকসেবায় এআই প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমানো এবং বিক্রি বাড়ানোর কাজ চলছে পুরোদমে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতি চলতি বছর শেষে ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। এ ছাড়া ২০৩৫ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ই-কমার্স খাতের প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্রেতা এখন দামি বা জটিল ইলেকট্রনিক্স পণ্য কেনার আগে বিভিন্ন পণ্যের বৈশিষ্ট্য তুলনা করতে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবসায় এআই চালিত কাস্টমাইজড ব্যবস্থার কারণে পণ্য বিক্রির হার গড়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে এবং একেকজন গ্রাহকের অর্ডারের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘শপি’-র উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট গ্রাহক অনুসন্ধানের প্রায় ৮০ শতাংশ এখন এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে সমাধান করছে। এর ফলে গ্রাহকসেবায় তাদের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে এসেছে।

কেনাকাটার পাশাপাশি অনলাইন ভ্রমণ টিকিট বুকিং, ভাষা অনুবাদ, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ফুড ডেলিভারি সেবায় এআই প্রযুক্তি ব্যবসায়িক সফলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও এআইয়ের প্রতি আস্থা বাড়ছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৬২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, এক বছর আগের তুলনায় এখন তারা এআই টুলের দেওয়া তথ্যের ওপর বেশি ভরসা করেন। এমনকি ৭৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা এআই এজেন্টকে নিজের পক্ষ থেকে পণ্য কেনাকাটা বা সেরা ছাড় খুঁজে নেওয়ার মতো স্বয়ংক্রিয় কাজের দায়িত্ব দিতে প্রস্তুত। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই এআই নির্ভর প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।