থানার দরজা ভেঙে আটক ২২ কিশোরের পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার দাউদকান্দিতে কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযানে সন্দেহভাজন কিশোরদের আটকের পর দাউদকান্দি মডেল থানায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। থানার একটি কক্ষের দরজা ভেঙে আটক কিশোরদের একটি অংশ বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া কিশোরের সংখ্যা ১৭ থেকে ২২ জন বলা হলেও পুলিশ বলছে, বিষয়টি মূলত অভিভাবকদের ভিড় ও হট্টগোলের মধ্যে ঘটে এবং আটক কিশোরদের যাচাই-বাছাই শেষে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত দাউদকান্দি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযান শেষে সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজন কিশোরকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

বাংলাদেশ টাইমসের প্রতিবেদনে পুলিশের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দিনভর অভিযানে ২৮ জন কিশোরকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিল। রাতের দিকে তাদের থানায় রাখাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে ২২ জন কিশোর থানার দরজা ভেঙে বেরিয়ে যায় বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কিশোরদের অভিভাবক ও স্বজনেরা থানার সামনে জড়ো হতে থাকেন। 

তাদের অভিযোগ ছিল, আটক কিশোরদের অনেকের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ-সংক্রান্ত কোনো পূর্ব রেকর্ড নেই। এ নিয়ে থানার সামনে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থানার একটি কক্ষে থাকা কিশোরদের একাংশ চেয়ার-টেবিল সরিয়ে ও দরজা ভেঙে বের হয়ে আসে। পরে থানার সামনে তাদের একটি অংশকে স্লোগান দিতেও দেখা যায়। ঘটনাটির কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

১৭ কিশোরের ভাঙচুরের অভিযোগ

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে অবশ্য ঘটনাটির আরেকটি বিবরণ এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে থানার পাশের একটি পার্ক থেকে ১৭ কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। পরে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে ভাঙচুর চালায়। চেয়ার-টেবিল উল্টে দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিউটি অফিসার এএসআই সাজ্জাদ হোসেন ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে। একই সঙ্গে থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম বলেছেন, ঘটনার পর কিশোরদের নাম-ঠিকানা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

দরজা ভেঙে পালানোর অভিযোগ

ঢাকা পোস্ট, আমার দেশসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ১৭ কিশোর দরজা ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্র ও ভিডিও ফুটেজের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আটক কিশোরদের একটি বিশেষ কক্ষে রাখা হয়েছিল। রাতের দিকে ওই কক্ষের দরজা ভেঙে কয়েকজন বেরিয়ে আসে এবং এ সময় চেয়ারসহ কিছু আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দাউদকান্দি থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম ঘটনাটিকে বড় ধরনের কিছু হিসেবে দেখছেন না বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ টাইমসের প্রতিবেদনে ওসির বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রয়োজনে ঘোরাঘুরির কারণে সন্দেহভাজন হিসেবে ২৮ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের স্বজনেরা একসঙ্গে থানায় আসায় ভিড়ের সৃষ্টি হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ২২ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়, আর ছয়জনের যাচাই-বাছাই চলছিল।

আটক নিয়ে আরও তথ্য

ঘটনাটির আরেকটি প্রতিবেদনে আরও বড় সংখ্যার কথা বলা হয়েছে। আজকালের খবরের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দাউদকান্দি মডেল থানা ও গৌরীপুর তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৫৯ কিশোরকে আটক করেছিল। তাদের মধ্যে ২৮ জনকে একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে ওসির বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিভাবকেরা সন্তানদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য থানায় ভিড় করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় বাইরে থেকেও উত্তেজনা ছড়ানো হয় এবং থানার দিকে ঢিল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। একটি পুরোনো দরজার অংশ খুলে যায় এবং ভিড়ের মধ্যে কয়েকটি চেয়ার উল্টে যায় বলে ওসি জানিয়েছেন।

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান কেন

সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংবিরোধী নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্ধ্যার পর অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাইরে ঘোরাঘুরি নিয়েও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ডেকে বিষয়টি জানানো হচ্ছে।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার জেলার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালানো হয় এবং বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে কালবেলার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

যা এখনো পরিষ্কার নয়

দাউদকান্দি থানার ঘটনাকে ঘিরে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে।

প্রথমত, থানায় মোট কতজন কিশোর আটক হয়েছিল—কোনো প্রতিবেদনে ২৮, আবার অন্য প্রতিবেদনে ৫৯ জনের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দরজা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া কিশোরের সংখ্যা নিয়েও ১৭ ও ২২—দুই ধরনের তথ্য এসেছে। তৃতীয়ত, ঘটনাটি আসলে ‘পালিয়ে যাওয়া’ নাকি অভিভাবকদের উপস্থিতির মধ্যে কিশোরদের পরে জিম্মায় দেওয়া—এ বিষয়েও পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে কিছু সংবাদমাধ্যমের বর্ণনার পার্থক্য রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আটক কিশোরদের সবাই যে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের কথা বলা হয়েছে এবং পুলিশ তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই করছিল। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সবাইকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ হবে না।

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসায় প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত করতে পুলিশের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য, থানার সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২ কিশোরকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাউদকান্দি থানার ওসি জানিয়েছেন। তবে দরজা ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং থানায় ভাঙচুরের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বর্ণনা ও পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য থাকায় বিষয়টি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

—জা. অর্থনীতি/এনজে