শফিকুল ইসলাম শামীম: গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামার উৎপাদন কার্যক্রম থেকে সরে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার অনিবন্ধিত খামার পরিচালিত হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার, যা পাঁচ বছর আগে প্রায় ২ লাখ ছিল।
শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। অনেক খামারি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে ভোক্তাদের আরও বেশি দামে ডিম কিনতে হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএ’র সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ২০২০ সালের আগে দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ পোল্ট্রি খামার ছিল। কিন্তু গত ৫ বছরে ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিরতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কারণে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি বলেন, পোল্ট্রি খাত শুধু প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করে না, এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় খাত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে আরও বিপুল সংখ্যক খামারি উৎপাদন থেকে সরে যাবেন। এতে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং পোল্ট্রি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিপিআইএর নেতারা জানান, উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় না এনে বাজারে ডিমের মূল্য নির্ধারিত হওয়ায় খামারিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে লোকসান বহন করতে করতে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন। ফলে নতুন করে বিনিয়োগ বা উৎপাদন সম্প্রসারণের সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি কয়েকটি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে—উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এমন একটি মূল্য কাঠামো নির্ধারণ করা, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান; বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেই মূল্য নিয়মিত সমন্বয় করা; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করা; এবং পোল্ট্রি শিল্পের টেকসই উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার, খামারি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বাজারে ডিম ও মুরগির সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন- বিপিআইএর মহাসচিব এম. সাফির রহমান, সহ-সভাপতি মো. আসাদুজ্জামান মেজবা এবং যুগ্ম মহাসচিব অঞ্জন মজুমদার।
তারা বলেন, পোল্ট্রি খাতকে টেকসই রাখতে এখনই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনও বাড়বে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
—জা. অর্থনীতি/এনজে
