পুশব্যাক ও পরিচয়হীনতার সংকটে সীমান্তে বাঙালি মুসলমান
ছবি: সংগৃহীত

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে এখন এক গভীর মানবিক সংকট আর অজানা আতঙ্ক। কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতের অভ্যন্তর থেকে জাতিগত বাঙালি মুসলমানদের বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া (পুশব্যাক) হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের তথ্য ও অনুসন্ধানে সীমান্ত অঞ্চলের যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং এক পরিকল্পিত জাতিগত নিপীড়নের ইঙ্গিত দেয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই জোরপূর্বক বিতাড়ন অভিযান নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ তাড়ানোর নামে রাতারাতি হাজার হাজার মানুষকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার এক অঘোষিত তৎপরতা চালাচ্ছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।

এইচআরডব্লিউ-এর মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কিছু স্তব্ধ করে দেওয়া তথ্য:

সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ মানুষকে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে পুশব্যাক করা হয়েছে।

বিএসএফের জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার নীতির কারণে অনেক পরিবারকে সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো-ম্যানস ল্যান্ড) খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশেষ করে পঞ্চগড় সীমান্তে এমন একটি পুশব্যাকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭৫ ঘণ্টা ধরে চরম মানবিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল।

কথিত অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণের নামে অনেকের নাম ভারতের ভোটার তালিকা থেকে একতরফাভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কোনো রকম আইনি সহায়তা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই নেওয়া হচ্ছে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত। এমনকি বৈধ ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও অনেককে আটক ও পুশব্যাক করার প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া বা আদালতের রায় ছাড়া কাউকে এভাবে জোরপূর্বক অন্য দেশে রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মৌলিক অধিকারবিষয়ক নীতিমালার পরিপন্থি। সংস্থাটি ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের সরকারের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সীমান্তে এই অমানবিক ‘পুশব্যাক’ কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

সীমান্ত অঞ্চলের এই নাগরিকত্ব ও পরিচয় যাচাইয়ের বিতর্ক আজ কেবল দুটি দেশের সীমান্ত সুরক্ষার বিষয় নয়, এটি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের লড়াই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সংবেদনশীল বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর উচিত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দিল্লির নীতিতে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

আজকের এই সংকট আমাদের বিবেকের সামনে কিছু অবাধ্য ও জ্বলন্ত প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়—

যে ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র হিসেবে দাবি করে, সেখানে কেবল ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে লাখ লাখ মানুষকে নাগরিকত্বহীন করার এই রাষ্ট্রীয় তৎপরতা কি একবিংশ শতাব্দীর এক নীরব জাতিগত নিধনের দিকে ইশারা করছে না?

তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’র তকমা দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই আগ্রাসন কি প্রকারান্তরে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না?

কাঁটাতারের ওপারে যে শিশুর কান্না আজ বাতাসে ভাসছে, তার কি কোনো দেশ নেই, কোনো অপরাধ ছাড়া কেবল জন্মপরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়ার এই নির্মম নিয়তি বিশ্ব বিবেক আর কতদিন মুখ বুজে সহ্য করবে?

জা. অর্থনীতি/ উমার