প্রকৃতি-ইতিহাসে সমৃদ্ধ চট্টগ্রামের পর্যটন
ছবি: সংগৃহীত

সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: একদিকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, অন্যদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এসেছে স্বচ্ছ জলধারা, কোথাও পাহাড়ের কোলে শান্ত হ্রদ। আবার কোথাও ইতিহাসের পুরোনো স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে। প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বন্দরনির্ভর নগরসভ্যতার অনন্য সমন্বয়ে চট্টগ্রাম হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় এক পর্যটনভূমি।

উত্তরের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড থেকে দক্ষিণের আনোয়ারা, পটিয়া ও উপকূলীয় জনপদ-চট্টগ্রামের বিস্তৃত ভূগোলে রয়েছে ঝরনা, পাহাড়, সমুদ্র, বন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সৌন্দর্য। কোথাও ঝরনার শব্দ, কোথাও সমুদ্রের গর্জন, কোথাও মেঘের সঙ্গে পাহাড়ের লুকোচুরি। ফলে চট্টগ্রামের পর্যটন শুধু প্রকৃতিনির্ভর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চ, ইতিহাস ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি।

ঝরনার দেশে পর্যটনের হাতছানি চট্টগ্রামের উত্তর প্রান্তে মিরসরাইয়ের পর্যটন মানচিত্রে খৈয়াছড়া, মহামায়া, রূপসী, নাপিত্তাছড়া ও বোয়ালিয়ার মতো ঝরনা ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে এসব গন্তব্যে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা ভ্রমণকারীদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। খৈয়াছড়ায় পাহাড়ের গভীরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় শহরের কোলাহল; শোনা যায় ঝরনার পানি ও বনের শব্দ। মহামায়ার পাহাড়ঘেরা জলরাশি, সবুজ পরিবেশ ও শান্ত প্রকৃতি তৈরি করেছে ভিন্ন আবহ। নৌভ্রমণ ও কায়াকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডও এখানে পর্যটনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চন্দ্রনাথ সমুদ্রসৈকত থেকে মিরসরাইয়ের পর সীতাকুণ্ড। এখানকার পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্ম, ইতিহাস ও প্রকৃতি। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত প্রাচীন চন্দ্রনাথ মন্দির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। একই সঙ্গে পাহাড়ে ওঠার দুর্গম পথ ও ওপর থেকে বিস্তৃত ভূদৃশ্য ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করে।

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী সৈকতও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। বিশেষ করে গুলিয়াখালীর সবুজ তৃণভূমি, কেওড়া বন ও নীল জলরাশি তৈরি করেছে ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক দৃশ্য। নগরীর ভেতরেও পর্যটনের গল্প পাহাড়-ঝরনা পেরিয়ে নগর চট্টগ্রামে প্রবেশ করলে বদলে যায় দৃশ্যপট। ব্যস্ত সড়ক, বন্দর ও বাণিজ্যের কোলাহলের মাঝেও রয়েছে প্রকৃতি ও ইতিহাসের নানা ঠিকানা। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এর অন্যতম। কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে দাঁড়িয়ে একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে বন্দরের জাহাজ চলাচল- সব মিলিয়ে বিকেল ও সন্ধ্যায় এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে।

নগরীর ফয়'স লেকও দীর্ঘদিন ধরে পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের জনপ্রিয় স্থান। পাহাড় ও কৃত্রিম হ্রদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ স্থান নগরের ব্যস্ততার মধ্যে অবকাশের সুযোগ তৈরি করেছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার চট্টগ্রামের পর্যটন শুধু পাহাড় ও সমুদ্রকেন্দ্রিক নয়। পাথরঘাটার পুরোনো স্থাপনা, কদম মোবারক মসজিদ, হযরত শাহ আমানত (র.)-এর মাজার, বার আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত স্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবাহী ওয়ার সিমেট্রি শহরের ঐতিহাসিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। সিআরবির শতবর্ষী গাছ, পাহাড়ি ঢাল ও রেলওয়ের পুরোনো স্থাপনা নগরের ভেতর প্রকৃতি ও ইতিহাসের অনন্য সমন্বয় তৈরি করেছে। এসব সম্পদ হেরিটেজ ট্যুরিজমের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।

কর্ণফুলীর ওপারে নতুন সম্ভাবনা কর্ণফুলী টানেল চালুর পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের পর্যটনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টানেল পেরিয়ে সহজেই যাওয়া যায় আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকতে। তুলনামূলক নিরিবিলি এ সৈকতের আকর্ষণ ঝাউবন, বিস্তৃত তটরেখা ও খোলা পরিবেশ।

পরিকল্পিতভাবে হোটেল, রিসোর্ট, খাবারের ব্যবস্থা, বিনোদনকেন্দ্র ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে উঠলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম স্বতন্ত্র পর্যটন বলয় হিসেবে বিকশিত হতে পারে। পর্যটনে অর্থনীতির সম্ভাবনা পর্যটক একটি এলাকায় গেলে শুধু হোটেল বা প্রবেশমূল্যে অর্থ ব্যয় করেন না; পরিবহন, খাবার, স্থানীয় পণ্য, গাইড, নৌযান, দোকান ও বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পরিকল্পিত পর্যটন স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয় খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর সুফল সরাসরি স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। তবে প্রকৃতিই চট্টগ্রামের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আবার বড় ঝুঁকিও। ঝরনা, পাহাড়, সৈকত ও হ্রদে বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ পর্যটনের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের পথে বাধা। তাই প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শৌচাগার, নিরাপত্তা, উদ্ধারব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পর্যটকদেরও পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল হতে হবে।