রুম্মন রহমান, ঢাকা: মাত্র সাড়ে পাঁচ মাস। এর মধ্যেই বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ থেকে বেড়ে ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের এই অবকাঠামো এখন আর শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়ছে ছোট দোকান ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। তবে এই বিস্তারের গল্প শুধু মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়ার নয়, বরং দেশের দৈনন্দিন কেনাকাটায় নগদ টাকার বিকল্প হয়ে ওঠার এক নতুন সম্ভাবনারও।
মতিঝিলের একটি টং দোকানের চা বিক্রেতা দেলোয়ারও তার দোকানে বাংলা কিউআর কোড রেখেছেন। তার দোকানে চা খেতে আসা অনেক ক্রেতাই এখন ২০ থেকে ৩০ টাকার মতো ছোট অঙ্কের বিলও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পরিশোধ করেন। আগে যেখানে এমন কেনাকাটায় নগদ টাকা বা খুচরা পয়সার প্রয়োজন হতো, এখন মুঠোফোনে স্ক্যান করেই দাম মেটানোর সুযোগ রয়েছে।
দেলোয়ারের কাছে অবশ্য শুরুতে বিষয়টি এতটা সহজ মনে হয়নি। ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে তার মনে কিছুটা দ্বিধা ছিল। তবে ব্যবহার করতে করতে সেই ধারণা বদলেছে। দেলোয়ার বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা অনেক ঝামেলার কাজ। এখন সহজই মনে হয়।
বাংলা কিউআরের জনপ্রিয়তা যে বাড়ছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানেও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ এপ্রিল দেশে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার। সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে, ১৯ সেপ্টেম্বর এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজারে। অর্থাৎ এ সময়ে মার্চেন্টের সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণের বেশি। নতুন করে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ২৫ লাখ ৬০ হাজার মার্চেন্ট।
ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়তে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১ এপ্রিল ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতাদের নিজস্ব কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর চালুর নির্দেশ দেয়। ৩০ জুনের মধ্যে এ পরিবর্তন সম্পন্ন করার সময়সীমা ছিল, আর ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআরকে অভিন্ন ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর করা হয়। ফলে আগে অন্য কিউআর ব্যবস্থায় থাকা মার্চেন্টদের বাংলা কিউআরে স্থানান্তরও সংখ্যাবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ধীরগতির পর হঠাৎ বড় উল্লম্ফন
বাংলা কিউআর নেটওয়ার্কের বিস্তারের গল্পে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে জুলাইয়ের পর। বছরের প্রথমদিকে মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়ছিল ধীরে ধীরে। ১ এপ্রিল দেশে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৭০ হাজারে, জুনে হয় ১৩ লাখ ৬০ হাজার। এরপর যেন বদলে যায় বৃদ্ধির গতি। ১ জুলাই পর্যন্ত মার্চেন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে, ১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ লাখ ৩০ হাজারে। অর্থাৎ এই দুই মাসেই মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৯ দিনেই বাংলা কিউআর নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছেন আরও ৪ লাখ ২০ হাজারের বেশি মার্চেন্ট। এতে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট মার্চেন্টের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজারে।
তৎক্ষণিকভাবে টাকা পাবেন ব্যবসায়ীরা
বাংলা কিউআরের ব্যবহার সহজ করতে নতুন নিয়ম চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের (পিএসডি) সার্কুলার নম্বর ০৫-এর মাধ্যমে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে সফল লেনদেনের অর্থ মার্চেন্টের ব্যবসায়িক হিসাবে তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। ফলে ক্রেতা পেমেন্ট করার পর ব্যবসায়ীদের অর্থ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
বাংলা কিউআর ব্যবহার আরও সহজ করতে ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) মোবাইল অ্যাপের হোমপেজে সহজে চোখে পড়ে এমন স্থানে বাংলা কিউআরের আইকন রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের গ্রাহকরাও যেন নিজ নিজ অ্যাপ ব্যবহার করে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে।
বাংলা কিউআরে লেনদেনে কমল ফি, রয়েছে প্রণোদনা
বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে লেনদেনের ফি কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ধরা যাক, একটি দোকান থেকে ৫০০ টাকার পণ্য কিনে বাংলা কিউআরে দাম পরিশোধ করলেন এক ক্রেতা। এই লেনদেনে আইআরএফ শূন্য হওয়ায় এ খাতে ফি দিতে হবে না। পাশাপাশি, নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে গ্রাহকের পেমেন্টের উৎস প্রতিষ্ঠান বা ইস্যুয়ার ১ টাকা এবং দোকানির পক্ষে পেমেন্ট গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান বা অ্যাকোয়ারার ৫০ পয়সা প্রণোদনা পেতে পারে। এভাবে ফি কমানো ও প্রণোদনার মাধ্যমে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) শূন্য করা হয়েছে। ফলে এই ফি বাবদ সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের মধ্যে অর্থ আদান-প্রদানের প্রয়োজন থাকছে না।
একইসঙ্গে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনে ব্যাংক ও অন্যান্য সেবাদাতাকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ২ হাজার টাকা পর্যন্ত সফল লেনদেনের ক্ষেত্রে ইস্যুয়ারের জন্য শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ এবং অ্যাকোয়ারারের জন্য শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হারে মাসিক প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে।
একটি কোডেই একাধিক সেবায় লেনদেন
বাংলা কিউআরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করে। ফলে মার্চেন্টকে প্রতিটি সেবাদাতার জন্য আলাদা কিউআর কোড প্রদর্শনের প্রয়োজন কমে আসে। ক্রেতাও তার ব্যবহার করা সমর্থিত অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এর আরেকটি সুবিধা হলো, ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের জন্য প্রচলিত পয়েন্ট অব সেল বা পস মেশিনের মতো যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয় না। দোকানে কিউআর কোড প্রদর্শন করেই অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা সেবাদাতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও ব্যবস্থা থাকতে হয়।