জাতীয় অর্থনীতি অনলাইন: পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুর, ঢাকার মিরপুর এবং আশুলিয়ার প্রধান প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।
গাজীপুরে পুলিশ বক্সে আগুন, বিজিবি মোতায়েন
সকাল সাড়ে আটটার দিকে কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনকারীদের একাংশ একটি পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় সেখানে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. তাহেরুল হক চৌহান বলেন, 'আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে দাবি আদায়ের নামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।'
শ্রমিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন শ্রমিকেরা। এর অংশ হিসেবে আজ সকালেও শ্রমিকেরা প্রথমে নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করেন। তবে কিছুক্ষণ পরই কাজ বন্ধ করে তাঁরা বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে নেমে পড়েন। লাঠিসোঁটা হাতে হাজার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়; এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও দূরপাল্লার পরিবহনের যাত্রীরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সম্প্রতি গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক ও সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানার শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ করছেন। সরকার শ্রমিকদের বেতন পর্যালোচনায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও অনেক কারখানায় অসন্তোষ ও আন্দোলন থামেনি। এর আগে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন শ্রমিকেরা। রাতে তারা অবরোধ তুলে নিলেও আজ সকাল থেকে পুনরায় সড়কে অবস্থান নেন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোহেল রানা বলেন, 'আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা শ্রমিকদের সাথে আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি।'
মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ. পুলিশের গাড়িতে আগুন
রাজধানীর মিরপুরেও টানা আন্দোলনের অংশ হিসেবে রোববার সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এতে ওই এলাকা দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেলের তিন স্টেশন। মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বেলা ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন বন্ধ থাকে। এ সময় মেট্রো রেল চলাচল করলেও এই তিন স্টেশনে কোনো ট্রেন থামেনি।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মেট্রোরেলের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মহসিন শেখ। তিনি বলেন, 'শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিরাপত্তাজনিত কারণে সাময়িক সময়ের জন্য মেট্রোরেলের তিন স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। তবে দুপুর ২টায় সবগুলো স্টেশন খুলে দেওয়া হয়েছে।'
এদিকে মিরপুরে পোশাক শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংর্ঘষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। আন্দোলনকারীরাও মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয়।
আশুলিয়ায় সড়কে শ্রমিক-পুলিশ মুখোমুখি
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়ার বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন নিট এশিয়াসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে থাকায় এই মুহুর্তে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সকালে কারখানায় কর্মবিরতি পালনের পর কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসেন। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শ্রমিকেরা শারমিন গ্রুপের গেটের সামনে অবস্থান নেন এবং ওই কারখানার শ্রমিকদেরও ছুটি দিয়ে বের করে দেওয়ার দাবি জানান।
এ সময় কারখানায় হামলা এড়াতে শিল্প পুলিশ সদস্যরা গেটের সামনে অবস্থান নিলে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেও আশপাশের সব কারখানা ছুটি দেওয়ার দাবিতে পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এই বিক্ষোভের মুখে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
গাজীপুর ও সাভারে অন্তত ৮০ কারখানায় ছুটি
এদিকে এমন পরিস্থিতিতে দুই জেলার অন্তত ৮০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
আজ সকালের দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও দুপুর থেকে সাভারে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন স্থান ও কারখানার সামনে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় সাভারের অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১–এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ: মিরপুরে ৩ মেট্রোস্টেশন বন্ধ
রাজধানীর মিরপুর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় মেট্রোরেলের ৩টি স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রোববার (১ নভেম্বর) দুপুর ১২টায় সংঘর্ষের পর থেকে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
মেট্রোরেল পুলিশের (এমআরটি পুলিশ) অপারেশন বিভাগের পরিদর্শক মো. মহসীন শেখ গণমাধ্যমকে স্টেশনগুলো বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
—জা.অর্থনীতি/আরএস