এলডিসি উত্তরণ সংস্কারই হোক অগ্রাধিকারভিত্তিক লক্ষ্য

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা চলতি ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও একে স্থায়ী সমাধান ভাবার অবকাশ নেই। বরং বাড়তি তিন বছর দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সরকারের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। সব সংস্কার একসঙ্গে করার চেষ্টা না করে যেসব পদক্ষেপ অর্থনীতি ও রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে, সেগুলো আগে বাস্তবায়ন জরুরি। 

এ লক্ষ্যে প্রথমে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও ব্যাংক খাতের সংস্কার করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ব্যাংক খাতের অনিয়ম অর্থনীতির সক্ষমতা ক্ষুণ্ন করছে। খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সমন্বিত নীতি গ্রহণ প্রয়োজন। অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী না হলে অন্য সংস্কারের সুফলও সীমিত থাকবে।

রাজস্ব সংস্কার ও ব্যবসার ব্যয় কমানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ায় উন্নয়ন ও জনসেবায় প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের ডিজিটালায়ন এবং কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা নিবন্ধন, অনুমোদন ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও হয়রানি কমাতে হবে। করের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা অধিক কার্যকর হবে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে গেলে এ নির্ভরতা বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। তাই ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি বাড়াতে হবে। নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস এবং যুক্তরাজ্যের বিকল্প অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা অর্জনের প্রস্তুতি নিতে হবে। শ্রম অধিকার, মানবাধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নও এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

অগ্রাধিকার দিতে হবে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে। প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, গবেষণা, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা দূর করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। রপ্তানি প্রণোদনার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উদ্ভাবন, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

সময় সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও জরুরি। ২০২৬-২৯ মেয়াদের প্রতিটি সংস্কারের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণ করতে হবে। প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে ঘাটতি চিহ্নিত ও সংশোধনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকার, বেসরকারি খাত, শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ ও দায়িত্বও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানো বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত সময়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু সেই সুযোগের মূল্য নির্ধারিত হবে বাস্তব সংস্কারের মাধ্যমে। প্রথমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন, এরপর রাজস্ব ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি— এ ধারাবাহিকতায় এগোতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ২০২৯ সালকে সামনে রেখে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বাড়তি তিন বছরও কেবল সময়ক্ষেপণের অধ্যায় হয়ে থাকবে; আর সময়মতো সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারলে এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়াকে স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়াকে সাময়িক অবকাশ নয়, বরং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার শেষ সুযোগগুলোর একটি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।