সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়ে ব্যাংকারদের দ্বন্দ্ব; কেন মুখোমুখি অবস্থানে শীর্ষ ব্যাংকাররা? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের ঋণসংকট ঘিরে মুখোমুখি দেশের শীর্ষ ব্যাংকাররা। একদিকে ব্যবসা সচল রাখতে নতুন ঋণ ও ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব। অন্যদিকে ব্যাংকের পাওনা আদায়ে কারখানা ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রির দাবি। প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে এই টানাপড়েনে বড় প্রশ্ন, কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে সিটি গ্রুপ, আর কীভাবেই বা নিরাপদ থাকবে ব্যাংকের অর্থ?

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণ ছিল ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ফান্ডেড এবং ৭ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড ঋণ।

 

ঋণের বড় অংশ রয়েছে কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংকের কাছে। এইচএসবিসির পাওনা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২ হাজার ১০০ কোটি, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৪৪০ কোটি, ইউসিবির ১ হাজার ১৬৭ কোটি এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

ঋণসংকটের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিসহায়তায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ ছিল। তবে ঋণের শ্রেণিমান অনুযায়ী প্রভিশন সংরক্ষণ এবং প্রকৃত আদায় ছাড়া সুদ আয় হিসেবে না দেখানোর শর্তও ছিল। বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন ঋণের শ্রেণিমান নির্ধারণ ও পাওনা আদায় নিয়ে ব্যাংকগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের আশঙ্কা, এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অন্তত ২৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের শ্রেণিবিন্যাস, আদায় এবং ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের ওপর।

সংকট সমাধানে ব্যাংকারদের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন। তার পক্ষে থাকা কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী দাবি, দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের পাশাপাশি নতুন করে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেওয়া হোক। তাদের যুক্তি, ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে পাওনা আদায় আরও কঠিন হবে। তাই কারখানা সচল রেখে ধাপে ধাপে ঋণ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

মাসরুর আরেফিন জানান, কিছু সম্পদ বিক্রি করে অবশিষ্ট ঋণ পুনঃতফসিলের একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। নতুন অর্থায়ন পাওয়া গেলে সিটি গ্রুপের ব্যবসা পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হতে পারে।

তবে অন্য ব্যাংকারদের উদ্বেগ, নতুন অর্থায়নের আগে বিদ্যমান ঋণের বিপরীতে সম্পদ ও পণ্যের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দাবি, চলতি মূলধনের অর্থের একটি বড় অংশ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত আয় না আসায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ১০৯ একর জমিতে ছয়টি বড় কারখানা প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে সেগুলো উৎপাদনে যেতে পারেনি। এসব প্রকল্প থেকে আয় না আসায় গ্রুপটির আর্থিক চাপ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি।

এদিকে সিটি গ্রুপের পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলার সুযোগ কমে যাওয়ায় ‘তীর’ ব্র্যান্ডের পণ্যের সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইপিও, বন্ড, সুকুক বা প্রেফারেন্স শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা এখন থমকে আছে।

ঋণের বোঝা কমাতে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প, আটটি চা-বাগান এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিক্রির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংকে নিয়োগ দিয়েছে সিটি গ্রুপ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্প বিক্রির কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তাও সম্ভাব্য ক্রেতাদের আগ্রহে প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাতীয় অর্থনীতিকে জানিয়েছেন, বন্ধ কলকারখানা সচল রাখা এবং অর্থনীতির গতি বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য। সিটি গ্রুপসহ ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে জটিলতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ব্যাংক, গ্রাহক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধানের চেষ্টা চলছে।

এখন বড় প্রশ্ন, নতুন অর্থায়ন দিয়ে কি সিটি গ্রুপকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি সম্পদ বিক্রি করে আগে ব্যাংকের পাওনা কমানো হবে? প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার এই ঋণসংকটের সমাধান শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি