ব্যাংক ও সেবা ছাড়া সব শেয়ারের দরপতন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দুর্গাপূজার ছুটিসহ কয়েক দিনের বিরতি শেষে আবার লেনদেনে ফিরেছে পুঁজিবাজার। কিন্তু প্রথম কার্যদিবস কেটেছে নেতিবাচক ধারায়। গতকাল রোববার ব্যাংক এবং সেবা ও আবাসন খাত ছাড়া সব খাতের শেয়ারের দরপতন হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেনের পরিমাণও আবার ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমেছে। এই চিত্র বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে মুনাফার অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির চাপে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের নজর এখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রান্তিক আর্থিক ফলাফল ও লভ্যাংশের দিকে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানির আয় ও ভবিষ্যৎ মুনাফার সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। তবে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা কীভাবে শেয়ারদরে প্রভাব ফেলছে, তা নির্দিষ্ট কোম্পানির লেনদেন ও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করতে হবে।

এদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির চাপও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর গতকাল মূল্যস্ফীতির চাপে নতুন করে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সঞ্চয়ের ওপর চাপ ভোগ্যপণ্য খাতের চাহিদা এবং ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপও বাজারের উদ্বেগের আরেকটি কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আমদানি-নির্ভর শিল্প ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। জ্বালানি, পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি মুনাফার ওপর চাপ ফেলতে পারে— বিশেষ করে যেসব কোম্পানির পক্ষে বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করা কঠিন। তবে গতকালের দরপতনে এ বিষয়টির সুনির্দিষ্ট অবদান নির্ধারণ করা যায়নি।

বাজারের খাতভিত্তিক লেনদেনে ব্যাংকের শেয়ার ছিল সবচেয়ে সক্রিয়। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে মোট ৯৭ কোটি ১৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা মূল বাজারের মোট লেনদেনের ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ। খাতটির দর বেড়েছে ১ শতাংশ। সিটি ব্যাংক, ইউসিবি, প্রাইম ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারে দরবৃদ্ধি দেখা গেছে।

অন্যদিকে বস্ত্র খাতে ৬৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হলেও খাতটির দর কমেছে ১ শতাংশ। সায়হাম টেক্সটাইল, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও মেট্রো স্পিনিংয়ের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়েছে। পাট খাতের দর কমেছে ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ, সিমেন্ট খাতে ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং সিরামিক খাতে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ চিত্রে ব্যাংক খাতের ইতিবাচক প্রবণতার বিপরীতে অন্যান্য খাতে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।

লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। দিনটিতে ব্যাংকটির ৩২ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। সিটি ব্যাংকের লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ৩৮ লাখ ৯০ হাজার টাকার, আর শেয়ারদর বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকের দর ৪ শতাংশ এবং লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের দর ৫ শতাংশ কমেছে। সূচকে এ দুই কোম্পানির নেতিবাচক অবদানও ছিল উল্লেখযোগ্য।

দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৮ দশমিক ০৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪৩২ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। দরপতন হয়েছে লেনদেন হওয়া ৩৮৫ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৮৩টির। বেড়েছে ৬৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৮টির। মূল বাজারে লেনদেন আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ৪৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নেমেছে।

সামগ্রিকভাবে বাজারের এ চিত্রে একদিকে ব্যাংক খাতে লেনদেনের ঘনত্ব ও দরবৃদ্ধি, অন্যদিকে অধিকাংশ শেয়ারে দরপতন এবং লেনদেন সংকোচন দেখা যাচ্ছে। তবে এটিকে বিনিয়োগকারীদের নিশ্চিতভাবে ব্যাংকমুখী হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ প্রবণতা কতটা স্থায়ী, তা বোঝার জন্য পরবর্তী কার্যদিবসগুলোতে খাতভিত্তিক লেনদেন, কোম্পানির আর্থিক ফলাফল এবং বাজারের বিস্তৃতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।