ড্যাপ সংশোধনে বদলে যাচ্ছে ঢাকার ভবিষ্যৎ (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ঢাকায় একটু বৃষ্টি হলেই কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট। জনসংখ্যার চাপ, খোলা জায়গার অভাব—সব মিলিয়ে নগরজীবন এমনিতেই কঠিন। এর মধ্যেই রাজধানীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় নতুন পরিবর্তন এনেছে সরকার।

একদিকে, পূর্বাচল ও ঝিলমিলে ভবন নির্মাণে বাড়তি সুবিধা। অন্যদিকে, বুড়িগঙ্গার তীরের তিনটি প্লটকে উন্মুক্ত স্থান থেকে ভারী শিল্প এলাকার আওতায় আনার সুযোগ। সঙ্গে বদলেছে পানি প্রবাহ এলাকার বিধানও।

 

১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ড্যাপের এই সংশোধনী নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা। কেন এই পরিবর্তন? আর এর প্রভাব কি শুধু জমি ও ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি শেষ পর্যন্ত পড়বে সাধারণ নগরবাসীর জীবনেও?

প্রথম পরিবর্তন: একই জমিতে আরও বড় ভবন?

প্রথম পরিবর্তনটি পূর্বাচল ও ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পে। পাঁচ কাঠা বা তার চেয়ে বড় আবাসিক প্লটের মালিকেরা এখন নির্ধারিত শর্তে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক পাঁচ এফএআর সুবিধা পাবেন। কিন্তু এফএআর কী?

সহজভাবে বললে, একটি জমির আয়তনের তুলনায় সেখানে সব তলার মোট কতটুকু জায়গা নির্মাণ করা যাবে, তার হিসাবই এফএআর। এফএআর বাড়লে নিয়মের সীমার মধ্যে ভবনের মোট ব্যবহারযোগ্য মেঝের আয়তনও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, একই জমিতে আরও বেশি নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়।

এই সুবিধা পেতে ১৫ অক্টোবর থেকে ছয় মাসের মধ্যে রাজউকে নকশা অনুমোদনের আবেদন করতে হবে। চূড়ান্ত অনুমোদনের এক বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ প্লিন্থ লেভেল বা ভিত্তির নির্ধারিত উচ্চতা পর্যন্ত নিতে হবে। তা না হলে নকশা অনুমোদন ফির ২০ গুণ জরিমানার বিধান রয়েছে।

তবে মনে রাখতে হবে, এফএআর বাড়লেই ইচ্ছেমতো উঁচু ভবন নির্মাণ করা যাবে না। রাস্তার প্রশস্ততা, ভবনের চারপাশে ফাঁকা জায়গা, ভূমি আচ্ছাদন ও উচ্চতার অন্যান্য বিধান বহাল থাকছে।

দ্বিতীয় পরিবর্তন: বুড়িগঙ্গার তীরে ভারী শিল্পের সুযোগ

ঢাকার শ্যামপুর ও কদমতলীর আইলবাহার মৌজার ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগের তিনটি জমির শ্রেণি বদলানো হয়েছে। আগে ড্যাপে এগুলো উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সংশোধিত পরিকল্পনায় শর্তসাপেক্ষে সেখানে ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, অনুমোদন ছাড়াই সেখানে কারখানা গড়ে তোলা যাবে। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী অবস্থানের কারণে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনাপত্তি এবং রাজউকের নির্মাণ অনুমোদন প্রয়োজন। নদীতীর রক্ষার বিধিও মানতে হবে।

কিন্তু এখানেই মূল উদ্বেগ

বুড়িগঙ্গা এমনিতেই দূষণের চাপে রয়েছে। নদীর কাছাকাছি ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ বাড়লে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীর পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে—সেই প্রশ্ন উঠছে। অবশ্য শুধু জমির শ্রেণি পরিবর্তন হয়েছে বলেই দূষণ বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তও এখনই টানা যায় না। প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কী ধরনের শিল্প স্থাপিত হচ্ছে, কী অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে এবং পরিবেশগত নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে তার ওপর।

তৃতীয় পরিবর্তন: পানি প্রবাহের নিয়মে কী বদল?

তৃতীয় পরিবর্তনটি কাগজে-কলমে কিছুটা জটিল, কিন্তু এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ড্যাপে কোনো জমি এক ধরনের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত, অথচ পানি প্রবাহ এলাকার নির্দেশনায় অন্য ধরনের ব্যবহার দেখানো—এমন অসামঞ্জস্য হলে কী হবে? নতুন সংশোধনীতে এ প্রশ্নের উত্তর বদলানো হয়েছে।

এখন নির্ধারিত কিছু ক্ষেত্রে ড্যাপের প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহারের নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জমির ব্যবহার ঠিক করা হবে। অনুমোদিত আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে তাদের অনুমোদিত লে-আউট পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে এই নিয়ম সবার জন্য নয়। জমির রেকর্ডে খাল, পুকুর, রাস্তা, চলাচলের পথ বা জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত জমি এবং সরকারি খাস জমির ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য হবে না।

তাহলে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ ও জলাশয়, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে এবং নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখে। এসব জায়গায় অপরিকল্পিত নির্মাণ হলে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে নতুন বিধান মানেই সব জলাশয় ভরাটের অনুমতি—এমন নয়। কোন জমিতে কী ব্যবহার অনুমোদিত হবে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, পরিকল্পনা ও প্রযোজ্য আইন দেখতে হবে।

আপত্তি কেন; পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ কী?

এই তিন পরিবর্তন নিয়েই আপত্তি তুলেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট—আইপিডি এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স—বিআইপি।

আইপিডির অভিযোগ, ড্যাপ সংশোধনের আগে যথেষ্ট কারিগরি যাচাই, পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে আলোচনা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি। সংগঠনটি বলছে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে শিল্প ও আবাসন খাতের ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আরও সতর্ক করেছেন, বন্যাপ্রবাহ এলাকা, নদীতীর ও উন্মুক্ত স্থানের সুরক্ষা দুর্বল হলে ঢাকার জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত সংকট বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, বিআইপির সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলামও যথাযথ আলোচনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ ছাড়া এমন পরিবর্তন আনার সমালোচনা করেছেন। আইপিডি এই গেজেট বাতিলের পাশাপাশি ছয়টি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সংশোধনের পেছনের কারণ ও সুপারিশকারীদের পরিচয় প্রকাশ, কারিগরি তদন্ত, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ড্যাপ পরিবর্তনের আগে পরিবেশগত প্রভাব যাচাই নিশ্চিত করা।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিকল্পনা বদলের অভিযোগটি আইপিডির বক্তব্য। স্বাধীন তদন্তের ফল ছাড়া একে প্রমাণিত দুর্নীতি বা অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ঢাকার ধারণক্ষমতা কতটা?

এখন প্রশ্ন, ভবন বাড়বে, শিল্প স্থাপনের সুযোগ বাড়বে—কিন্তু সেই বাড়তি চাপ সামলানোর প্রস্তুতি কতটা?

আরও ভবন মানে শুধু বেশি মেঝে নয়; সেখানে মানুষের বসবাস ও কাজের সঙ্গে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, সড়ক, গণপরিবহন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং উন্মুক্ত স্থানের চাহিদাও জড়িত। আবার শিল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বর্জ্য শোধন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নদী সুরক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।

পরিকল্পনাবিদদের মূল উদ্বেগ এখানেই। নির্মাণের সুযোগ বাড়ানোর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার অবকাঠামো ও পরিবেশ কতটা চাপ নিতে পারবে, তার নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন।

তবে এই সংশোধনীতে ঠিক কত অতিরিক্ত মানুষ বসবাস করবেন, যানজট কতটা বাড়বে কিংবা জলাবদ্ধতা কতটা তীব্র হবে—এমন কোনো পরিমাপযোগ্য প্রভাবের হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।

উন্নয়ন, নাকি ভবিষ্যতের বাড়তি চাপ?

ড্যাপের এই সংশোধনী ঘিরে বিতর্ক শুধু তিনটি প্লট কিংবা কয়েকটি আবাসিক ভবনের নয়। প্রশ্নটি আরও বড়। ঢাকা কেমন শহর হবে, আর সেই শহরে বসবাসের পরিবেশ কতটা নিরাপদ থাকবে?

আবাসন ও শিল্পের বিকাশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি দরকার জলাশয়, নদীতীর, পানি প্রবাহের পথ এবং নাগরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা।

তাই এই বিতর্কের নির্ভরযোগ্য সমাধান শুধু পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্যে নয়; প্রয়োজন সংশোধনের কারিগরি ভিত্তি প্রকাশ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নের জবাবদিহি। কারণ, একটি শহরের পরিকল্পনা কাগজে বদলানো সহজ। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হতে পারে সেই শহরের অসংখ্য মানুষকে—বছরের পর বছর।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি