জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: চীনের রপ্তানি বাড়ছে, শুনতে ভালো খবর। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি কি আসলেই ভালো? চীনের কারখানায় উৎপাদন বাড়লে বিশ্ববাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ে, আবার কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। কিন্তু একই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের তখন আরও শক্ত প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। তাহলে চীনের রপ্তানি শক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, নাকি নতুন অর্থনৈতিক চাপ?
চীনের রপ্তানি আবারও বিশ্ব অর্থনীতির আলোচনায়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটির রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বাজারের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সম্পর্কিত প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন শুল্কের আগে পণ্য পাঠানোর প্রবণতা।
চীনের উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিও দ্রুত বাড়ছে। বছরের প্রথম সাত মাসে দেশটির সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ চীনের রপ্তানি গল্প এখন শুধু পোশাক, খেলনা কিংবা সাধারণ পণ্যে আটকে নেই এআই, চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই খবরের অর্থ কী?
প্রথমত, চীনের শক্তিশালী রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে।
বিশ্ববাজারে একই ধরনের পণ্যের সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমার চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল বা অন্যান্য রপ্তানি খাতকে তখন একই ক্রেতার জন্য চীনের বড় উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব থাকতে পারে।
চীনের বড় উৎপাদন ক্ষমতার কারণে বিভিন্ন পণ্য তুলনামূলক কম দামে আন্তর্জাতিক বাজারে আসতে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি এসব পণ্য আমদানি করেন, তাহলে স্থানীয় ভোক্তা কম দামে পণ্য পাওয়ার সুবিধা পেতে পারেন।
কিন্তু একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হতে পারে।
ধরা যাক, একটি পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদন করতে যে খরচ হয়, চীনের কোনো প্রতিষ্ঠান সেটি আরও কম দামে তৈরি করে বিশ্ববাজারে পাঠাতে পারছে। তখন বাংলাদেশের উদ্যোক্তার সামনে দুটি পথ উৎপাদন খরচ কমানো, অথবা পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়িয়ে আলাদা বাজার তৈরি করা।
তবে চীনের রপ্তানি বাড়া মানেই বাংলাদেশের জন্য খারাপ এমন সরল হিসাবও ঠিক নয়।
চীনের উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতের বিস্তার বাংলাদেশের জন্য নতুন সরবরাহ চেইন তৈরি করতে পারে। চীনা কোম্পানিগুলো যদি বিভিন্ন দেশে উৎপাদন ছড়িয়ে দেয়, বাংলাদেশও বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
এছাড়া চীনের শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও প্রযুক্তি তুলনামূলক সহজলভ্য করতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশ কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে?
শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। কারণ চীন এখন ক্রমেই প্রযুক্তি, অটোমেশন ও উচ্চমূল্যের উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, চীনের নতুন রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে এআই, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সবুজ প্রযুক্তির মতো খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তাই বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সস্তা পণ্য তৈরি করা নয়। দক্ষ শ্রমিক, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, মানসম্পন্ন পণ্য, দ্রুত সরবরাহ এবং নতুন বাজার, সবকিছুর ওপর জোর দিতে হবে।
চীনের রপ্তানি যত বাড়বে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতাও তত বাড়বে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগও হতে পারে যদি বাংলাদেশ সস্তা শ্রমের অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি অর্থনীতিতে যেতে পারে।
চীনের শক্তিশালী রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে?
চীনের জুলাই রপ্তানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা বাজারের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। এআই-সম্পর্কিত পণ্যের চাহিদা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের আগে পণ্য পাঠানো এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। চীনের উচ্চপ্রযুক্তি রপ্তানিও দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এতে সুযোগ যেমন আছে, তেমনি প্রতিযোগিতার চাপও বাড়বে। চীনের কম খরচের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বাংলাদেশকে শুধু সস্তা শ্রম নয়, প্রযুক্তি, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের মানে এগোতে হবে।
চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা, নাকি ঝুঁকি?
চীন বেশি পণ্য রপ্তানি করলে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়? চীনের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমানোর চাপ তৈরি করতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আরও কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়বেন, আবার স্থানীয় বাজারেও সস্তা চীনা পণ্যের সঙ্গে দেশীয় উৎপাদকদের লড়তে হবে। তবে চীনের উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিস্তার বাংলাদেশের জন্য সরবরাহ চেইন ও বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করতে পারে। তাই আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর না করে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি অর্থনীতিতে যেতে পারবে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি