জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
মাস শেষে বেতন পাবেন তো? নাকি কাল সকালে অফিসে গিয়ে দেখবেন আপনার পদটিই আর নেই? সরকারি চাকরিতে নতুন পে-স্কেলের সুবাদে বেতন আর সুযোগ-সুবিধা দ্বিগুণ হচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি খাতে কি চাকরির কোনো নিরাপত্তা আদৌ আছে?
২০২৬ সালের জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। নতুন এই কাঠামো কার্যকর ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।
এই পে-স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির হিসাব নয়। এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে আয়, গ্রেড এবং ক্যারিয়ারের একটা সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকে। একজন সরকারি কর্মী পরিষ্কার জানেন, কোন গ্রেডে তার মূল বেতন কত, কীভাবে তার পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি হবে এবং রাষ্ট্রীয় চাকরির সাথে কী কী আর্থিক সুরক্ষা যুক্ত। কিন্তু বেসরকারি খাতের চিত্রটা একদমই আলাদা।
একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, একই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও দুটো আলাদা প্রতিষ্ঠানে বেতনের আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়। কারণ সাধারণ বেসরকারি বা করপোরেট চাকরির জন্য সরকারি পে-স্কেলের মতো কোনো অভিন্ন, গ্রেডভিত্তিক জাতীয় বেতন কাঠামো নেই।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে বেসরকারি খাতে কোনো ন্যূনতম মজুরি নেই। বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতের জন্য আলাদা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক মজুরি কাঠামো আছে, কিন্তু একজন সাধারণ বেসরকারি অফিসকর্মী বা করপোরেট কর্মীর জন্য অভিন্ন গ্রেডভিত্তিক বেতন ব্যবস্থা নেই। আর এই জায়গাটিতেই উঠে আসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-চাকরির নিরাপত্তা।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে, ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বদলালে তার প্রথম ধাক্কা গিয়ে পড়ে বেসরকারি কর্মীদের ওপর। নিয়োগের সময় যে কর্মী অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, পরিস্থিতি বদলালেই তিনি হয়ে যান খরচ কমানোর প্রথম টার্গেট। এটিই ‘হায়ারিং অ্যান্ড ফায়ারিং’ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
আজ যে কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন, মাস শেষে বেতন নিচ্ছেন, কালই হয়তো তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো-তার পদটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আর একটা চাকরি হারানোর ধাক্কা শুধু একা ওই কর্মীর ওপর পড়ে না। এর সাথে সরাসরি জড়িয়ে থাকে মাস শেষের বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, পরিবারের ওষুধপত্রের খরচ, ঋণের কিস্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের সব আয়াজন। অর্থাৎ বেসরকারি চাকরির অনিশ্চয়তা কেবল একটি কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, এটি সরাসরি একটি পরিবারের টিকে থাকার প্রশ্ন।
তবে বাংলাদেশের শ্রম আইনে কর্মী ছাঁটাই একদমই অনিয়ন্ত্রিত নয়। অন্তত এক বছর ধারাবাহিকভাবে কাজ করা কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করতে হলে লিখিত নোটিশ এবং নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণের বিধান আছে। আইনে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এক মাসের লিখিত নোটিশ অথবা তার সমপরিমাণ মজুরি এবং প্রতি পূর্ণ বছরের জন্য ৩০ দিনের মজুরি বা গ্র্যাচুইটি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সুতরাং সমস্যা কিন্তু আইনের অনুপস্থিতি নয়। আসল সমস্যা হলো-আইনের এই সুরক্ষা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং চাকরি হারানোর পর একজন কর্মী কত দ্রুত বিচার পাচ্ছেন। এখানেই নতুন কিছু নীতিগত সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রথমত, অহেতুক ছাঁটাই ঠেকাতে শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে হবে। একজন কর্মী চাকরি হারিয়ে যদি বছরের পর বছর আদালতে দৌড়াতে থাকেন, তবে কাগজে থাকা আইন তার কোনো কাজে আসে না।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন কাজ করা কর্মীদের জন্য শক্তিশালী সেভারেন্স পে বা চাকরি-শেষ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালু করা দরকার। বহু বছর কাজ করার পর হঠাৎ পদ বাতিল হলে এক মাসের নোটিশের পাশাপাশি তিন থেকে ছয় মাসের সেভারেন্স পে চালুর মতো নীতি ভাবা যেতে পারে।
অবশ্য ব্যবসার স্বাভাবিক পরিচালনা ব্যাহত না করে কীভাবে কর্মী ও মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করা যায়, সেটিই আসল নীতিনির্ধারণের জায়গা।
সরকারি কর্মীদের নতুন পে-স্কেল যখন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হচ্ছে, তখন বেসরকারি খাতের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও এমন কাঠামোবদ্ধ চিন্তার সময় এসেছে। কারণ একটি চাকরির সাথে কেবল একটি বেতন নয়, জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
বেসরকারি চাকরিতে আজ আছেন কাল নেই
২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে আয় ও ক্যারিয়ারের নিরাপত্তা নির্দিষ্ট থাকলেও বেসরকারি খাতে নেই কোনো অভিন্ন বেতন কাঠামো। একই যোগ্যতায় দুই প্রতিষ্ঠানে দুই ধরনের বেতন। সরকারি কর্মীদের সুবিধা বাড়লেও বেসরকারি কর্মীরা কি পেছাবে? নাকি বেসরকারি খাতের জন্যও অভিন্ন কাঠামো তৈরি জরুরি? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
আজ চাকরি আছে কাল থাকবে তো?
আজ অফিসে আছেন, কাল সকালে চাকরিটা থাকবে তো? বেসরকারি খাতে ব্যবসায়িক মন্দা বা অর্থনৈতিক চাপ এলেই প্রথম কোপটা পড়ে কর্মীদের ওপর। এই ‘হায়ারিং অ্যান্ড ফায়ারিং’ সংস্কৃতি কেবল একজন কর্মীর কাজ কেড়ে নেয় না, থমকে দেয় একটি পরিবারের জীবন। যদিও শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের কথা বলা আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন কতটুকু? একজন কর্মীর ভবিষ্যৎ কি শুধুই অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে? আপনার কী মনে হয়?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি