রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনকে কেন পাশে চায় বাংলাদেশ?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু, মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর নিরাপত্তা সংকটে বারবার থমকে গেছে সেই প্রক্রিয়া। এবার সমাধানের সন্ধানে চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে ঢাকা।

কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ওপর কেন গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ? আর বেইজিংয়ের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থই বা কীভাবে এই সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?

চীনকে কেন যুক্ত করছে বাংলাদেশ?

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলে চীন গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ। কারণ, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকা ও নেপিডোর রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক। ২০১৯ সালে জাতিসংঘের সদর দফতরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় চীন মধ্যস্থতা করেছিল। পরবর্তী সময়েও প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় বেইজিং যুক্ত ছিল।

তবে, এসব উদ্যোগের কোনোটিই এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করবে ঢাকা। অর্থাৎ, চীনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে নয়, মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।

রাখাইনে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ

চীনের ভূমিকা বুঝতে হলে নজর দিতে হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দিকে। এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, কায়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীনে যাওয়া তেল ও গ্যাস পাইপলাইন।

এসব প্রকল্প চীনের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে, রাখাইনে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা চলতে থাকলে চীনের অবকাঠামো ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে এখানেই রয়েছে সংকটের জটিলতা।

তথ্যসূত্র: চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাখাইনের প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য

চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রাখাইনে স্থিতিশীলতার প্রয়োজন তৈরি করলেও, সেই স্থিতিশীলতা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা নয়। কারণ, প্রত্যাবাসনের সঙ্গে জড়িত নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো প্রশ্ন।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক হিসাব

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তারও বড় চাপ। জাতিসংঘে ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেওয়ার ফলে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তা খাতে চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ঢাকা একদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চীনসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক সহযোগিতা চাইছে। কারণ, রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন; সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন কেবল দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলছে, প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমারের সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য

চীনের প্রভাব কি খুলবে প্রত্যাবাসনের পথ?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। আর রাখাইনে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় স্থিতিশীলতা চায় বেইজিং। কিন্তু, চীনের স্বার্থ আর রোহিঙ্গাদের অধিকার, দুই বিষয়কে একই সমীকরণে মেলানোই এখন ঢাকার কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

কারণ, প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্ত পার হওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এটি হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং টেকসই। চীন আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু, চূড়ান্ত সমাধানের জন্য প্রয়োজন মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি