বেতন বাড়ল নাকি ক্রয়ক্ষমতা কমল?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মাসের শেষে একাউন্টে মোটা অংকের টাকা ঢুকছে, কিন্তু বাজার থেকে ফেরার সময় হাতের থলেটা আগের চেয়ে হালকা লাগছে কেন? সংখ্যার বিচারে বেতন বাড়লেও আপনার কষ্টার্জিত টাকার প্রকৃত ক্ষমতা কি আদতে বাড়ল, নাকি মূল্যস্ফীতি আর টাকার অবমূল্যায়নের গ্যাঁড়াকলে পড়ে পিষে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন?

নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল ঘোষিত হলে সবার মুখে এক ধরনের স্বস্তি ফুটে ওঠে। ভাবনায় আসে, এবার হয়তো জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হবে, পছন্দের তালিকায় থাকা বাড়তি কিছু জিনিস কেনা যাবে। কিন্তু কিছুদিন পার হতেই দেখা যায় বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারে গিয়ে যখন এক ব্যাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি টাকা গুণতে হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না-কাগজের নোটে লেখা অংক বৃদ্ধি পাওয়া আর পকেটের প্রকৃত ক্ষমতা বাড়া এক জিনিস নয়।

এই বৈষম্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো টাকার অবমূল্যায়ন এবং গত কয়েক বছরে জমতে থাকা পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি। সহজ কথায়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রেক্ষাপটে বা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপে যখন দেশীয় মুদ্রার মান কমে যায়, তখন একই পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। গত কয়েক বছরে ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার অভাবনীয় দরপতনের ফলে আমদানি করা পণ্য থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজারের খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ-সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।

ধরে নেওয়া যাক, আপনার বেতন হয়তো অঙ্কের হিসেবে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানো হলো। কিন্তু একই সময়ে যদি নিত্যপণ্যের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে দিনশেষে আপনার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার বদলে উল্টো কমে গেল। অঙ্কের হিসেবে আপনি বেশি বেতন পাচ্ছেন সত্য, তবে সেই বাড়তি টাকা মূলত বর্ধিত বাজারের খরচ মেটাতে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সঞ্চয়ের খাতা শূন্যই থেকে যাচ্ছে, আর মাস শেষে দেখা দিচ্ছে আগের মতোই টানাটানি।

অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় 'মানি ইলুশন' বা অর্থের মোহ। মানুষ যখন দেখে তার আয় বেড়েছে, তখন সে নিজেকে আগের চেয়ে ধনী মনে করে। কিন্তু যখন সে সেই অর্থ দিয়ে বাস্তব জিনিসপত্র কিনতে যায়, তখন আসল সত্য উন্মোচিত হয়। এই ক্রয়ক্ষমতার ক্রমঅবনতি সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দেয় স্থির আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। প্রতিটা পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির পেছনে মুদ্রাস্ফীতির যে অদৃশ্য কামড় লুকিয়ে থাকে, তা না সামলালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান প্রকৃতপক্ষে কখনোই বাড়ে না।

আপনার টাকা কি সত্যিই শক্তিশালী হলো?

মাসের শুরুতে বেতন বাড়ার মেসেজ দেখে মুখে হাসি ফুটেছিল? ভেবেছিলেন এবার হয়তো কিছুটা সঞ্চয় হবে? কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখলেন, যে টাকায় আগে এক মাসের পুরো বাজার হতো, এখন সেই টাকায় অর্ধেক থলেও ভরছে না! অঙ্কের হিসেবে বেতন বাড়লেও টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কিন্তু অবমূল্যায়ন আর মূল্যস্ফীতির আড়ালেই হারিয়ে গেছে। আপনার বেতনের মান বাড়ল নাকি শুধু সংখ্যা? ভেবে দেখেছেন কি?

বাড়তি বেতনেও কেন এত টানাটানি?

অর্থনীতির এক অদ্ভুত খেলা! পে-স্কেল বাড়ল, বেতন বাড়ে ১০, ২০ কিংবা ৩০ শতাংশ। কিন্তু তার আগেই বাজারের প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণ! আন্তর্জাতিক বাজারের চাপে মুদ্রার মান যত কমছে, আপনার পকেটের টাকার শক্তিও তত নিঃশেষ হচ্ছে। বেতন বাড়ার পর আপনার কি সত্যিই লাভ হলো, নাকি হিসেব মিলিয়ে দেখলেন দিনশেষে আপনি আগের চেয়েও বেশি টানাটানিতে আছেন? কমেন্টে জানান আপনার মতামত!  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি