মোঃ সাইফুল্লার রাব্বী
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ ব-দ্বীপ। এই ভূখণ্ডের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দ্বীপ। আর এসব দ্বীপের প্রতিটিতেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার নানান দুয়ার। পরিকল্পিতভাবে এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের পর্যটন খাতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তাই বলা চলে—বাংলাদেশে দ্বীপভিত্তিক পর্যটন এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি পর্যটনসম্ভাবনাময় দ্বীপ রয়েছে, যেগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে জনপ্রিয় দ্বীপভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র। দ্বীপাঞ্চলগুলোকে পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজমের আদলে সাজানো যেতে পারে। সেন্ট মার্টিন্স ও ছেঁড়া দ্বীপ, মহেশখালী, সোনাদিয়া,কুতুবদিয়া, নিঝুম দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ ও মনপুরা দ্বীপ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সেন্ট মার্টিন্স ও ছেঁড়া দ্বীপ
বাংলাদেশে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত দ্বীপগুলোর একটি সেন্ট মার্টিন্স। নীলাভ স্বচ্ছ জল, সারি সারি নারিকেলগাছ, সামুদ্রিক মাছ, প্রবাল, বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা—সব মিলিয়ে দ্বীপটির রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ হিসেবে সেন্ট মার্টিন্সের গুরুত্বও স্বতন্ত্র।
সেন্ট মার্টিন্সের কাছেই রয়েছে ছেঁড়া দ্বীপ। বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের অন্যতম আকর্ষণীয় এই স্থানটি তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও নির্জন পরিবেশের কারণে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেন্ট মার্টিন্স ও ছেঁড়া দ্বীপকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
মহেশখালী দ্বীপ
কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণেও দ্বীপটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আদিনাথ পাহাড়ের চূড়ায় আদিনাথ মন্দির, পাহাড়ের পাদদেশের বৌদ্ধ মন্দির, সারি সারি পানের বরজ, বার্মিজ মার্কেট ও শুঁটকির বাজার—সব মিলিয়ে মহেশখালীতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার সুযোগ। দিন দিন এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা।
সোনাদিয়া দ্বীপ
কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের অন্তর্গত সোনাদিয়া জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দ্বীপ। এখানে পৃথিবীর কিছু দুর্লভ পাখির দেখা মেলে, যা অন্য কোথাও সম্ভব নয়। বিভিন্ন প্রজাতির জলচর ও পরিযায়ী পাখির বিচরণ, সমুদ্রসৈকত, প্যারাবন, উপকূলীয় বনভূমি এবং ছোট-বড় খাল দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে করেছে অনন্য। প্রায় নয় কিলোমিটার বিস্তৃত এই দ্বীপের তিন দিকে সমুদ্র এবং বিভিন্ন স্থানে প্যারাবন রয়েছে। দেশের অন্যতম বড় শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেও সোনাদিয়ার পরিচিতি রয়েছে।
কুতুবদিয়া দ্বীপ
কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলা মূলত কুতুবদিয়া দ্বীপকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। প্রায় ২১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো বেশ কিছু স্থান রয়েছে। বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প, কুতুব শরীফ দরবার, কুতুব আউলিয়ার মাজার, বড়ঘোপ সমুদ্রসৈকত, প্রাকৃতিক উপায়ে লবণ তৈরির মাঠ, কুতুবদিয়া বাতিঘর, কালারমার মসজিদ, ফকিরা মসজিদ,ধুরুং স্টেডিয়াম, প্রাচীন দীঘির পাড়সহ নানা স্থাপনা ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য কুতুবদিয়াকে পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।
নিঝুম দ্বীপ
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা একখণ্ড সম্ভাবনার নাম নিঝুম দ্বীপ। বল্লার চর, কামলার চর, চর ওসমান ও চর মুরি—এই চারটি চরকে ঘিরে দ্বীপটির বিস্তার। একসময় এটি ওসমানীর চর ও স্বর্ণদ্বীপ নামেও পরিচিত ছিল। পুরো চরের আয়তন প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একর। নিঝুম দ্বীপে যাওয়ার পথে দেখা মেলে কালা মহিষের চর, কবিরের চর ও চৌধুরীর দ্বীপের মতো বিভিন্ন চরাঞ্চলের। ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ সবুজ প্রকৃতি ও ডোরাকাটা হরিণ দ্বীপটিকে দেশের অন্যান্য দ্বীপ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার ২০০১ সালে দ্বীপটির প্রায় ৯ হাজার ৫০ একর জায়গা জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে নিঝুম দ্বীপের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। পর্যটকদের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ নিশ্চিত করা গেলে দ্বীপটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
মনপুরা দ্বীপ
ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার মেঘনা নদীর মোহনায়, বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশির কাছে অবস্থিত মনপুরা দ্বীপ। প্রায় ৩৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ দেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বীপাঞ্চল। বন বিভাগের উদ্যোগে এখানকার দশটি চরে বনায়ন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। যা ভ্রমণপিপাসু মানুষের নজরে আসতে শুরু করেছে। জীববৈচিত্র্য, সবুজ প্রকৃতি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি মনপুরার পর্যটন আকর্ষণ বাড়িয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে মনপুরা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
শাহপরীর দ্বীপ
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত শাহপরীর দ্বীপ বাংলাদেশের স্থলভাগের দক্ষিণ সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। একদিকে স্থলভাগ, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি—প্রকৃতির এই মেলবন্ধন দ্বীপটিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা মাছ শিকার ও লবণ চাষ। একই সঙ্গে দ্বীপটির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।
বাংলাদেশের দ্বীপাঞ্চলগুলোর সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য প্রাকৃতিকভাবেই অনন্য। প্রতিটি দ্বীপের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য। এসব দ্বীপ ইতোমধ্যে দেশের পর্যটন মানচিত্রে আলাদা আলাদা আবেদন তৈরি করেছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের দ্বীপগুলোকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দেওয়া সম্ভব। এতে একদিকে যেমন দেশের পর্যটন খাত আরও সমৃদ্ধ হবে, অন্যদিকে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
লেখক: এসিস্টেন্ট ম্যানেজার, কাস্টমার সাপোর্ট এন্ড ট্রেনিং, সেবার বাংলাদেশ।