অনলাইন ডেস্ক: গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় হঠাৎ বিড়বিড় করা বা স্পষ্ট বাক্যে কথা বলার ঘটনা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ঘুমের ঘোরে কথা বলাকে ‘সোমনিলোকুই’ বলা হয়, যা মূলত এক ধরনের ‘প্যারাসোমনিয়া’ বা ঘুমজনিত আচরণগত পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়েবমেড ও ফোর্বস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এর হার সবচেয়ে বেশি হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা প্রাকৃতিকভাবে কমে আসে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়। মানুষ কেবল স্বপ্নের গভীরেই কথা বলে না, বরং ঘুমের যেকোনো পর্যায়েই এটি হতে পারে। ঘুমের নন-আরইএম পর্যায়ে মস্তিষ্কের আংশিক জাগ্রত অবস্থায় অস্পষ্ট শব্দ বা ছোট বাক্য বের হয়; আর স্বপ্ন দেখার আরইএম পর্যায়ে মস্তিষ্কের মোটর সংকেত মাংসপেশির স্বাভাবিক শিথিলতাকে ছাড়িয়ে গেলে মানুষ অবচেতনভাবেই বড় কোনো সংলাপ বা বক্তব্য উচ্চারণ করে ফেলে।
শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরেও কিছু মানসিক ও শারীরিক অনুঘটক ঘুমের ঘোরে কথা বলার প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ, দৈনন্দিন উদ্বেগ এবং নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া শরীরে উচ্চমাত্রার জ্বর থাকলে, মদ্যপান বা মাদকের প্রভাব থাকলে এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও মানুষ ঘুমের ঘোরে অস্বাভাবিক কথা বলতে পারে।
ঘুমের মধ্যে বলা কথার সঙ্গে ব্যক্তির বাস্তব জীবনের কোনো গোপন রহস্য ফাঁসের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল দীর্ঘদিনের। তবে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকেরা নিশ্চিত করেছেন যে, ঘুমের ঘোরে বলা কথা কোনোভাবেই বাস্তব সত্য প্রকাশ করে না; এর সিংহভাগই অর্থহীন, কাল্পনিক এবং যুক্তিহীন প্রলাপ। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত পিটি-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি উচ্চারণ করে তা হলো ‘না’। এছাড়া এতে ক্ষোভ, বিরক্তি বা উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ বেশি দেখা যায়, যা মূলত স্বপ্নের নেতিবাচক অনুভূতির প্রতিফলন। এমনকি আইনগত দিক থেকেও ঘুমের ঘোরে বলা কোনো কথাকে আদালতে বৈধ সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের ঘোরে কথা বলা মূলত একটি নির্দোষ ও ক্ষতিকরহীন জৈবিক অবস্থা, যার জন্য সাধারণত কোনো বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যদি হঠাৎ করে এটি তীব্র আকার ধারণ করে, তবে সতর্ক হওয়া উচিত। বিশেষ করে কথার সঙ্গে যদি প্রচণ্ড চিৎকার করা, শরীর ছটফট করা, হাত-পা ছোড়া বা তীব্র আতঙ্কের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা ‘নাইট টেরর’ বা ‘আরইএম স্লিপ বিহেভিয়র ডিজঅর্ডার’-এর মতো স্নায়বিক রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। একই সঙ্গে ঘুমের মধ্যে কথা বলার পাশাপাশি যদি অবচেতন মনে হেঁটে বেড়ানো বা খাওয়ার মতো অভ্যাস যুক্ত হয়, তবে অনতিবিলম্বে একজন ঘুম বিশেষজ্ঞের (স্লিপ স্পেশালিস্ট) পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ঘুমের ঘোরে কথা বলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকলেও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে এটি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এর জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া রাতে ঘুমানোর আগে মন শান্ত রাখার অভ্যাস করা, শোবার কয়েক ঘণ্টা আগে চা, কফি বা অ্যালকোহল পরিহার করা এবং ঘুমের সময়সীমা ও নিয়মিত সেবন করা ওষুধের একটি রুটিন বা রেকর্ড সংরক্ষণ করলে এই সমস্যা অনেকটাই হ্রাস পায়।
জেএ/অভি