সুরের মূর্ছনায় গৌরবের ২৫ বছর
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের শুভ্রতা আর চারপাশজুড়ে সুরের মূর্ছনা- এমন আবহে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বসেছে যন্ত্রশিল্পীদের মিলনমেলা। বেহালা, বাঁশি, তবলা, ঢোলসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে উঠেছে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। উপলক্ষ, পেশাদার যন্ত্রশিল্পীদের সংগঠন চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার রজতজয়ন্তী উদযাপন।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় সমবেত বেহালা পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনব্যাপী এ আয়োজন। 

‘ভায়োলিনিস্ট চট্টগ্রাম’-এর শিল্পীদের সমবেত বেহালা পরিবেশনার নেতৃত্ব দেন বিশিষ্ট বেহালাশিল্পী প্রিয়তোষ বড়ুয়া। বেহালায় আশীষ বসাক ও বাঁশিতে সুমন কুমার নাথ যৌথভাবে পিলু রাগে ধুন পরিবেশন করেন। তবলায় ছিলেন সুরজিৎ সেন।

বাচিকশিল্পী প্রবীর পাল ও আঁখি মজুমদারের সঞ্চালনায় এরপর ঢাক-ঢোল ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে বের হয় রজতজয়ন্তীর আনন্দ শোভাযাত্রা। চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি এম এম আলী রোড ও দামপাড়া সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন প্রজন্মের যন্ত্রশিল্পী, সংগঠনের সদস্য, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

শোভাযাত্রা শেষে মূল মঞ্চের সামনে ঢোলের তালে পরিবেশনায় অংশ নেন শিবু জলদাসসহ অন্য বাদকরা। শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসে পুরো প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাতীয় পতাকা ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন উড়িয়ে রজতজয়ন্তীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চৌধুরী।

উদ্বোধনী বক্তব্যে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যন্ত্রশিল্পীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগীতের মূল সুরকে প্রাণবন্ত করে তুলতে যন্ত্রশিল্পীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থা যেভাবে যন্ত্রশিল্পীদের সংগঠিত করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে আসছে, তা প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের নগর নয়, এটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও সমৃদ্ধ নগর। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিতে শিল্পী, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। যন্ত্রশিল্পীদের পেশাগত মর্যাদা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং নতুন প্রজন্মকে সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রচর্চায় উৎসাহিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

রজতজয়ন্তীর আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে সংগীতের নানা শাখা ও যন্ত্রশিল্পীদের অবদান তুলে ধরবে উল্লেখ করে মেয়র সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রজতজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক প্রবীর কুমার দত্ত সাজু, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও উদযাপন পরিষদের সদস্যসচিব সংকলন বড়ুয়াসহ বিভিন্ন প্রজন্মের যন্ত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনব্যাপী আয়োজনে রয়েছে র‌্যালি, রক্তদান কর্মসূচি, আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আয়োজকেরা জানান, চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যন্ত্রশিল্পীদের অবদানকে স্মরণ, সম্মান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

সংগীত ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রয়াত ছয় গুণী শিল্পীকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হবে। তারা হলেন- শাস্ত্রীয় সংগীতের ওস্তাদ নীরোদ বরণ বড়ুয়া, যন্ত্রসংগীতের ওস্তাদ রমনী মোহন দাশ, নৃত্যশিল্পী রুনু বিশ্বাস, আঞ্চলিক ও মাইজভান্ডারী সংগীতের শিল্পী আবদুল গফুর হালী, সংগীতশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক প্রবাল চৌধুরী এবং ব্যান্ড সংগীতের শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু।

এ ছাড়া বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ রফিকুল আলম, সংগীতশিল্পী আবিদা সুলতানা এবং গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গীকে।

বিকেল ৩টায় শুরু হবে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশন। এতে থাকবে সমবেত সংগীত, আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান। ভয়েস হান্ট সিজন-৩-এর বিজয়ী শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হবে। এরপর নৃত্য, বৃন্দ আবৃত্তি এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে সংগীতানুষ্ঠান। সবশেষে ব্যান্ড সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে দিনব্যাপী আয়োজন।

চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার আহ্বায়ক প্রবীর কুমার দত্ত সাজু ও সদস্যসচিব সংকলন বড়ুয়া বলেন, রজতজয়ন্তী শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নয়; এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যন্ত্রশিল্পী ও সংগীতসাধকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন। ২৫ বছরের পথচলায় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের মধ্যে আনন্দ ও আবেগের পাশাপাশি রয়েছে নতুন দিনের প্রত্যাশা। শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণের এ আয়োজন সেই প্রত্যাশাকেই সুর, ছন্দ ও বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় তুলে ধরেছে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি