নীতি সুবিধা ও চাহিদা নিরূপণ ছাড়াই বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে সরকার। লক্ষ্য বড় উড়োজাহাজ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রী বাড়ানো এবং কার্গো পরিবহনে নতুন সক্ষমতা তৈরি। কিন্তু প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ কি সত্যিই অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে? নাকি পর্যাপ্ত চাহিদা ও নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত না করেই এগোচ্ছে বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা? এ নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম আঞ্চলিক এয়ার হাব প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। ১৮ মাসের মধ্যে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবির কাছে সহায়তা চেয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও অন্যান্য প্রয়োজন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রানওয়ে ও উড়োজাহাজ চলাচলের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হতে পারে ১১৫ মিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৬০০ মিটার করার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বড় উড়োজাহাজের জন্য ৬ থেকে ৮টি পার্কিং স্ট্যান্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ এবং এয়ারবাস এ৩৩০ ও এ৩৫০-এর মতো উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণে প্রস্তাবিত ব্যয় ৪৩ মিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে বছরে যাত্রী ধারণক্ষমতা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চারটি নতুন বোর্ডিং সেতু নির্মাণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার সেন্টার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

কার্গো খাতেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। ২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে কার্গো ভিলেজ, শীতলীকরণ সুবিধা ও শুল্ক-নিয়ন্ত্রিত গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে বছরে পণ্য পরিবহন সক্ষমতা ৪০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ৭৫ হাজার থেকে এক লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ডিজিটাল ও নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং স্থলপথে যাতায়াতের সুবিধা বাড়াতেও বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রথম ধাপে সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি ৭৫ মিলিয়ন ডলার দেবে সরকার ও বেবিচক। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ালেই কি বিদেশি বিমান সংস্থা ও বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন?

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বিমানবন্দরটি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা, আন্তর্জাতিক রুটে ৪০ শতাংশ অগ্রাধিকারমূলক ট্যারিফ এবং ট্রানজিট ও জ্বালানি নেওয়ার সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। তার মতে, চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে শহরটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা, প্রকৃত যাত্রী ও কার্গো চাহিদা যাচাই না করে বড় বিনিয়োগ করলে প্রত্যাশিত সুফল নাও মিলতে পারে। কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে প্রত্যাশিত সুফল ও বিনিয়োগ নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, বিমানবন্দরের মাশুল প্রতিযোগিতামূলক করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে কার্যকর পণ্য পরিবহন সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক লাভ-ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা এবং দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, শাহ আমানত বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের পরিকল্পনায় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণে নয়; বাস্তব চাহিদা, ব্যবসাবান্ধব নীতি এবং বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রতিদান নিশ্চিত করার ওপর।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি