‘ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পর্যটনের নতুন দিগন্ত’

মো. সাইফুল্লার রাব্বী  

একসময় ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু হতো ট্রাভেল এজেন্সির দরজায় গিয়ে—টিকিট কাটা, হোটেল খোঁজা কিংবা গন্তব্যের তথ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। এসব প্রক্রিয়ায় যেমন ব্যয় হতো অতিরিক্ত সময়, তেমনি নানা পর্যায়ে মানুষের সহায়তার ওপরও নির্ভর করতে হতো। এখন সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পর্যটন খাতে পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা শুধু ভ্রমণের পদ্ধতিই নয়, বদলে দিতে পারে পুরো পর্যটন ব্যবস্থাপনার ধরন।

প্রযুক্তির এই দ্রুত রূপান্তরের সময়েই আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হবে বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য—‘পর্যটন বিনির্মাণে ডিজিটাল এজেন্ডা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। 

পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কীভাবে পরিচালনগত দক্ষতা বাড়াতে, ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিস্থাপক ও টেকসই পর্যটন খাত গড়ে তুলতে পারে—এবারের প্রতিপাদ্যে মূলত সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।

আধুনিক বিশ্বে পর্যটন শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন খাতও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে আগামী দিনের পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মানবসভ্যতা আধুনিক যুগে প্রবেশের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রথম শিল্পবিপ্লবের ক্ষেত্রে ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবে ১৮৭০ সালের দিকে বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার এবং তৃতীয় শিল্পবিপ্লবে ১৯৬৯ সালের দিকে ইন্টারনেটের বিকাশ বিশ্বকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। 

এসব প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মানবসভ্যতা আধুনিকায়নের সুযোগ পেয়েছে। এখন আমরা আরও একটি নতুন শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করছি, যাকে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিল্পবিপ্লব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ডিজিটাল বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবী নতুন রূপ পাবে এবং মানুষের জীবন ও কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। আগামী দিনের বিশ্ব পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতকেও সমৃদ্ধ করবে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

প্রথমেই ডিজিটাল বা তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের রূপরেখা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির টেকসই প্রয়োগ ও উন্নয়নই ডিজিটাল বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। যেসব প্রযুক্তি এই বিপ্লবকে আরও গতিশীল করছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-লার্নিং বা অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা, রোবোটিকস ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, জিনপ্রযুক্তি, ক্লাউড কম্পিউটিং, ই-ব্যবসা এবং ই-পর্যটন।

প্রযুক্তির এই বিপ্লবের ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, কারিগরি পেশার চাহিদা বাড়ছে এবং শিল্প খাতে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, বিশেষায়িত পেশার চাহিদা বাড়ছে এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ফোর্বস, দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এসব প্রভাব উঠে এসেছে।

পর্যটনেও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার

পর্যটন শিল্পেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে চোখে পড়ার মতো। উড়োজাহাজের আবিষ্কার বিশ্ব পর্যটনকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। সময়ের সঙ্গে বিমান যোগাযোগের বিস্তার, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ এবং অনলাইনভিত্তিক সেবার প্রসারের ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে এখন শত কোটির ঘর ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ই-পর্যটনের প্রবণতা।

পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত—এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর এবং বৈশ্বিক পর্যটন বিতরণব্যবস্থাগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।
এয়ারলাইনসগুলো টিকিট বুকিং, ইস্যু, পুনরায় ইস্যু ও অর্থ ফেরতের মতো কার্যক্রম কম্পিউটারভিত্তিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করছে। বিপণনের ক্ষেত্রেও তারা ব্যবহার করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। হোটেল পরিচালনা ও কক্ষ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে হোটেল ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ও অনলাইন সংরক্ষণব্যবস্থা। পর্যটনের বিভিন্ন সেবা ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার বাড়ছে অনলাইনভিত্তিক পর্যটন প্ল্যাটফর্মের।

পর্যটন-সংক্রান্ত তথ্য ও সেবা এখন ওয়েবসাইট, সংবাদপোর্টাল, অনলাইনভিত্তিক পর্যটন গ্রুপ, অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশেই পর্যটকেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভ্রমণের পরিকল্পনা, টিকিট ও হোটেল বুকিং থেকে শুরু করে পুরো ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করছেন।

বাংলাদেশেও বাড়ছে ডিজিটাল পর্যটন

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পেও ডিজিটালাইজেশনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দেশের প্রচলিত ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেটরের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেটরদের কার্যক্রমও বাড়ছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ব্র্যান্ডিং, পর্যটন গন্তব্যের প্রচার, পণ্য ও সেবার বিপণন এবং পর্যটন-সংক্রান্ত তথ্য প্রচার ও প্রসার আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

ইতিমধ্যে দেশের অনলাইনভিত্তিক ট্যুর অপারেটর ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গ্রাহকেরা ঘরে বসেই উড়োজাহাজের টিকিট, ট্যুর বুকিং, হোটেল বুকিং এবং খাবার অর্ডারের মতো বিভিন্ন সেবা পাচ্ছেন। এতে একদিকে তাঁদের সময় সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে এসব সেবা নিতে সরাসরি ট্রাভেল এজেন্সিতে যাওয়ার প্রয়োজনও কমছে।

আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে। নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এই শিল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং পর্যটন খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব পর্যটন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়; এটি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে পর্যটনসেবা আরও সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক করার পাশাপাশি দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

লেখক: এসিস্টেন্ট ম্যানেজার, কাস্টমার সাপোর্ট এন্ড ট্রেনিং ডিপার্টমেন্ট, সেবার বাংলাদেশ।