সংকটে জামদানি শিল্প, পেশা ছাড়ছেন কারিগররা
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

সুমন মিয়া, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ): একসময় সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরির জন্য নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের খ্যাতি ছিল দেশ-বিদেশে। সোনারগাঁয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার প্রাচীন বস্ত্রশিল্পের ঐতিহ্য। মসলিনের পাশাপাশি জামদানির সঙ্গেও এই জনপদের রয়েছে দীর্ঘ সম্পর্ক।

সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি এখনো দেখা যায় সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে। তবে আর্থিক সংকট ও কারিগর কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপণ্য চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের জন্য কয়েকটি দোকানে জামদানি শাড়ি ও কাপড় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও রাখা হয়েছে তাঁত, সুতা, নকশা তৈরির উপকরণসহ জামদানি তৈরির সরঞ্জাম। 

কীভাবে সুতা বুনে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়, সেটিও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লীতে জামদানি বুনছিলেন মো. মামুন মিয়া।

অনিশ্চয়তায় কাটছে জামদানি কারিগরদের জীবন

তিনি বলেন, ৩ পুরুষ ধরে আমরা এই কাজ করে আসছি। আমার দাদা করতেন, বাবা করতেন। আমিও প্রায় ২০ বছর ধরে জামদানি তৈরির সঙ্গে আছি। এই পেশা শুধু আমাদের ব্যবসা নয়, এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এখন জামদানির চাহিদা ভালো। সরকার যদি এই শিল্পের দিকে একটু সুনজর দেয়, বিশেষ করে তাঁতিদের ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারব।

স্বর্ণলতা জামদানি কুঠিরের প্রোপ্রাইটর মো. আবু তাহের বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে আমি এই কাজের সঙ্গে জড়িত। তবে ব্যবসাটা এখন আর আগের মতো ভালো নেই। মার্কেট থেকে শুরু করে দোকান পর্যন্ত সব জায়গাতেই বেচাকেনা কমে গেছে। মানুষ এখন অনলাইনে কেনাকাটায় বেশি আগ্রহী। আমরা অনলাইনের বিষয়গুলোও ভালোভাবে বুঝি না, ফলে আমাদের ক্রেতাও কমে গেছে। এখন মূলত সোনারগাঁ জাদুঘর ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কাছেই জামদানি বিক্রি করি।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে সব জামদানি হাতের তৈরি। শাড়ির দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। একসময় আমার তৈরি জামদানি লন্ডন, আমেরিকা, কলকাতা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যেত। কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে আর বিদেশে পাঠানো হচ্ছে না।

রপ্তানি বাড়াতে জিআই পণ্যের প্রসার ও উন্নয়ন কেন জরুরি

নিজের তৈরি জামদানি নিয়ে আবু তাহের বলেন, আমার তৈরি জামদানি শাড়ি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীও পরেছেন। এ নিয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছিলেন। এরপর কিছুদিন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালো হয়েছিল।

বর্তমান সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সোনারগাঁ জাদুঘরে এখন দর্শনার্থী কমে গেছে, তাই আমাদের বেচাকেনাও কমেছে। এখানে যারা দোকানদারি করেন, তাদের প্রায় সবাই ঋণগ্রস্ত। সরকারিভাবে যদি আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যেত, তাহলে আমরা এই শিল্পটা টিকিয়ে রাখতে পারতাম। সরকার সহজ কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার কথা বলে, কিন্তু আমরা সেই ঋণ পাই না। প্রকৃত শিল্পীরাই যদি সহজ শর্তে ঋণ পেতেন, তাহলে জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবার উপকৃত হতো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জামদানি তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগলেও অনেক কারিগর সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান না। উৎপাদন খরচ বাড়ায় কমেছে লাভ। আর্থিক সংকটে কেউ কেউ পেশা ছাড়ছেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ কমছে।

বাজারে মেশিনে তৈরি নকশাদার কাপড় জামদানি নামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এতে আসল হাতে বোনা জামদানির বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে জামদানির চাহিদা রয়েছে।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক নাসিব ইসলাম অভি বলেন, জামদানির চাহিদা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই রয়েছে। এর ঐতিহ্যবাহী নকশা ও বুননশৈলীর কারণে ২০১৬ সালে জামদানি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জামদানি শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক দিন আগে ফাউন্ডেশনে কর্মশালা ও নকশা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে