রপ্তানি বাড়াতে জিআই পণ্যের প্রসার ও উন্নয়ন কেন জরুরি

আবু তাহের খান: বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে বিশেষত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন-জিআই) পরিচিতি থাকার বিষয়টি বিশ্বজুড়েই দিন দিন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে যে, অদূর ভবিষ্যতে জিআই চিহ্নিত পণ্যগুলোই হয়তো আলাদা এক নতুন বাণিজ্য বলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং এই চিহ্ন ব্যবহার করে এগুলো ব্যাপক মাত্রার বাণিজ্যসুবিধাও লাভ করবে। কিন্তু খানিকটা হতাশার সঙ্গেই লক্ষ করা যাচ্ছে যে, এই জিআই পণ্য চিহ্নিতকরণ ও এর নিবন্ধনের বিষয়টি বাংলাদেশের উদ্যোক্তা, সরকার কিংবা উদ্যোক্তা-সংগঠন ইত্যাদি কারও কাছেই তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। জিআই স্বত্ব নিয়ে যখন মাঝে মাঝে অন্য দেশের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব বা সমস্যা তৈরি হয় তখনই কেবল সংশ্লিষ্টদের একটু নড়েচড়ে বসতে দেখা যায় এবং সমস্যা মিটে যাওয়ার পর আবার সেই পুরোনো নিদ্রা ও নিস্পৃহতার অবিরাম যাত্রা এবং এ যাত্রা এতটাই ধীরগতির যে, ২০১৫ সালে জামদানিকে বাংলাদেশের প্রথম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিদানের পর থেকে বিগত ১১ বছরে এ পর্যন্ত জিআইয়ের আওতায় নিবন্ধিত পণ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৪টি। অথচ ইরানের হস্তনির্মিত এক কার্পেটেরই ২৩ প্রদেশ বা অঞ্চলের ৪৫ পদের জন্য বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন- ডব্লিউআইপিও) স্বীকৃত আলাদা আলাদা নিবন্ধন রয়েছে ৪৫টি। বাংলাদেশে জিআই পণ্য চিহ্নিতকরণ ও এসবের নিবন্ধন সংক্রান্ত তৎপরতা ও গতিবিধি কতটা ধীরগতির তা বোঝার জন্য এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট বলে মনে করি। 

জিআই পণ্য হিসেবে যে ৬৪টি পণ্যকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) কর্তৃক নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে দেখে মনে হচ্ছে সেগুলোকে নিয়ে রাষ্ট্রের এতদসংক্রান্ত তৎপরতার মোটামুটি এখানেই সমাপ্তি। অথচ ইরানের জাতীয় কার্পেট কেন্দ্র (এনসিসিআই) জিআই পণ্য হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে নিবন্ধিত ৪৫ রকমের হস্তনির্মিত কার্পেট ইতোমধ্যে বিশ্বের ৬৫টি দেশে রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর এ ধরনের উদ্যোগ শুধু ইরান নয়, পশ্চিমের শিল্পোন্নত বহু দেশই বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ? বাংলাদেশ এসবের ধারেকাছেও নেই। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জামদানিকে ভারত কর্তৃক নিজেদের জিআই পণ্য হিসেবে বিতর্কিত ঘোষণাদানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করেনি। অথচ জিআই পণ্য হিসেবে মেধাস্বত্ব নিবন্ধনের প্রথা ফ্রান্স প্রথম শুরু করে ২০ শতকের প্রথম দশকে। অতঃপর এটি চালু করতে বাংলাদেশকে সময় নিতে হয়েছে ১০০ বছরেরও বেশি তাও আবার ভারতের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে। ভাগ্যিস ভারত এ অন্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল (ভারতের অন্যায় সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা হচ্ছে না)। নইলে এ উদ্যোগের জন্য আরও কত বছর অপেক্ষা করতে হতো কে জানে! যদিও এ জাতীয় কাজের দায়িত্ব নিয়ে ডিপিডিটি তাদের কার্যক্রম শুরু ১৯৮৯ সাল থেকে। অর্থাৎ কার্যক্রম শুরুর ২৬ বছর পর তারা প্রথমবারের মতো জামদানিকে জিআই সনদ প্রদান করে।

তো এই যখন ডিপিডিটি কর্তৃক জিআই পণ্য চিহ্নিতকরণ ও যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলোকে সনদ প্রদানের গতিধারা তখন বোঝাই যাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল হিসেবে জিআই যতই গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রে সহসাই খুব একটা এগুতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আর এই মুহূর্তে তেমনটি মনে হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনতর দক্ষতা ও গতি সঞ্চারের মাধ্যমে বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ধরনের প্রত্যয় ও অঙ্গীকারাবদ্ধতা প্রয়োজন সেটি এখনও পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে মোটেও চোখে পড়ছে না। তাহলে কি ধরেই নিতে হবে যে, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে জেনেশুনেই সজ্ঞানে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় অসহায়ের মতো পেছনের কাতারে বসে শুধু হাপিত্যেশ করবে আর বছর বছর আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে যেয়ে নিজেদের নীতি-সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে জনস্বার্থবিরোধী নানা শর্তে ঋণ প্রার্থনা করা অব্যাহত রাখবে? তেমনটি ঘটতে থাকলে এটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, বর্তমানে বছরে (২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব) প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশ হিমশিম খাচ্ছে সামনের দিনগুলোয় তা হয়তো আরও প্রকট হবে এবং এর প্রাকারান্তরিক ফলাফল যা দাঁড়াতে পারে তা হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রমেই আরও বেশি করে বৈদেশিক পণ্যের ভোক্তা-বাজারে পরিণত হবে এবং নিকট ভবিষ্যতে এ দেশের উৎপাদন-সামর্থ্য বাড়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়বে।

স্বীকার্য যে, রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য জিআই পণ্যের পরিধি বৃদ্ধি ও এর উন্নয়ন ঘটানোই একমাত্র শর্ত নয়। তবে গুরুত্বের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা শর্তগুলোর মধ্যে এটি অবশ্যই অন্যতম। খোদ ডব্লিউআইপিওর তথ্য থেকেই প্রমাণ মিলছে যে, পণ্যের এই জিআই ভাবমূর্তি ব্যবহার করে সাম্প্রতিককালে এশিয়ার চীন ও ভারত, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল এবং ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স ও অন্য ইইউভুক্ত দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান হারে তাদের প্রভাব বাড়াতে পারছে। চীনা পণ্যের দ্রুত সম্প্রসারণশীলতার দাপটে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো যে এখন নিয়ত কম্পমানতায় ভুগছে- ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বার বার অস্বাভাবিক উচ্চহারে শুল্ক আরোপ যে কম্পমানতার অংশ সেখানে চীনা জিআই পণ্যের ভূমিকাও নেহায়েত কম নয়। চীনের জাতীয় মেধাস্বত্ব প্রশাসনের (সিএনআইপিএ) দেওয়া ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী ৯ হাজার ৭৮৫টি পণ্যকে সেখানে জিআই পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যা দেশভিত্তিক হিসেবে পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রশাসন বলতে গেলে একেবারেই নির্বিকার। ডিপিডিটির ৩৭ বছরের কার্যকালের ইতিহাসে জনমতের চাপে পড়ে অনেকটা নিরুপায় হয়েই সর্বসাকুল্যে দুবার তাদের সক্রিয় হতে দেখা গেছে— একবার ২০১৫ সালে আরেকবার ২০২৪ সালে যথাক্রমে জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্ব হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে। 

আসলে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা, অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার তালিকা এত দীর্ঘ যে, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এ স্বল্প পরিসরের প্রবন্ধে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তবে পাশাপাশি এখানে এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এ ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা ও উদ্যমহীনতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাদের অনেকেই (সবাই নন) শ্রমিক ঠকিয়ে, কর ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নগদ প্রণোদনা গ্রহণের মাধ্যমে ও অন্য নানাবিধ হীনতাপূর্ণ উপায়ে লাভবান হওয়ার কৌশলগুলো যতটা সহজে বুঝেন, জিআই সনদ নিয়ে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার জায়গাটিতে তারা ততটাই অবুঝ থাকতে চান অথচ এর মাধ্যমেও বৈধভাবে লাভবান হওয়ার চমৎকার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেদিকটি নিয়ে আগানোর ব্যাপারে তাদের আগ্রহ খুবই কম। পরিশেষে তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সামনে রেখেএ বিষয়ে নিম্নে কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হলো:

এক. ২০৩০ সাল নাগাদ স্বীকৃত জিআই পণ্যের সংখ্যা বর্তমানের ৬৪ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১০০-তে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে বা তাদের সহযোগিতা নিয়ে ডিপিডিটি কর্তৃক চার বছরমেয়াদি একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। 

দুই. সনদপ্রাপ্ত জিআই পণ্যগুলোর উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাদি চিহ্নিত করে সেসব সমস্যার নিরসনে আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কাজটি ডিপিডিটির একার পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বিধায় এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। 

তিন. জিআই সনদপ্রাপ্ত ও প্রাপ্তব্য পণ্যাদি নিয়ে বিসিকের আওতায় রাজধানীর কোনো উপযুক্ত স্থানে (উত্তরা, পূর্বাচল ইত্যাদি) নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী সমৃদ্ধ একটি জাতীয় এম্পোরিয়াম স্থাপন করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের এম্পোরিয়াম রয়েছে যা দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের একটি ভালো উপলক্ষ হতে পারে।

চার. বিদেশে বাংলাদেশি জিআই পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্য ইপিবি তিন বা পাঁচ বছরমেয়াদি একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। তবে এ জন্য নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজন নেই- রাজস্ব খাতের আওতায়ই এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা যেতে পারে।

পাঁচ. উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে যেয়ে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এসব কর্মসূচির সর্বোচ্চ সুফল সর্বাগ্রে সংশ্লিষ্ট কারিগর, কারুশিল্পী, উদ্যোক্তা ও পণ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ব্যক্তিরা অবশ্যই পান। এর ভেতরে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ঢুকে যেয়ে যেন এর প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে না পারে।

জিআই পণ্যের উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে ক্রমান্বয়ে আরও অনেক কিছুই করার আছে। তবে আপাতত উপরোক্ত এ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা গেলেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে। কাজগুলোর অধিকাংশই নির্বাহী বিভাগের আওতাধীন দায়িত্ব। তবে এগুলোকে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষেরও কার্যকর নীতিগত সমর্থন লাগবে। আর অতি অবশ্যই এর সঙ্গে গ্রামভিত্তিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করা সমীচীন হবে বলে মনে করি। সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের সহযোগিতায় বাংলাদেশের জিআই পণ্যগুলো অচিরেই ইরানের কার্পেট কিংবা জাফরান, ফ্রান্সের সুগন্ধী কিংবা পনির, সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি কিংবা চকলেট, তুরস্কের খুবানি কিংবা জলপাই তেল এবং চীনের সিল্ক কিংবা চায়ের মতো বিশ্বনন্দিত হয়ে উঠবে— এটিই প্রত্যাশা। 

লেখক ও বিশ্লেষক

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]