অপ্রতিমকে ঘিরেই ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

কুবি প্রতিনিধি: দরজার বাইরে ঝোলানো কাঠের নামফলকটি দেখলে বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরে এখন কতটা শোক জমে আছে। নামফলকে মা-বাবার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল এক বালকের ছবি। পাশে লেখা-‘অপ্রতিমদের বাসা। প্রযত্নে-নাহিদ ও শাহরিয়ার।’

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার মমতাজ ভিলার ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দরজা পেরোতেই চোখে পড়ে একটি ফটোফ্রেম। সেখানে অপ্রতিমের ছোটবেলার ১৫টি ছবি সাজানো। কোনো ছবিতে সে হাসছে, কোনো ছবিতে মা-বাবার সঙ্গে। বয়সের সঙ্গে বদলে যাওয়া মুখের প্রতিটি ছবিই এখন পরিবারের কাছে অমূল্য স্মৃতি।

ছবির সেই বালক ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ১৩ বছরের অপ্রতিমকে ঘিরেই ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও শাহরিয়ারের সংসারের সব স্বপ্ন, আনন্দ আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। এখন সেই বাসাতেই অপ্রতিম নেই। আছে শুধু তার ছবি, বই-খাতা, বিছানা আর অসংখ্য স্মৃতি।

অপ্রতিমের ঘরটিও প্রায় আগের মতোই আছে। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বই-খাতা পড়ে আছে। বিছানায় রয়েছে তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র। বইয়ের তাকে সাজানো পছন্দের বইগুলোও আগের জায়গাতেই রয়েছে। শুধু বই খুলে পড়তে বসা সেই বালকটি নেই।

একটি কক্ষে বসে ছিলেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছেন তিনি। স্বজনেরা তাকে ঘিরে ছিলেন। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ নীরবে পাশে বসে আছেন। সন্তানের আকস্মিক মৃত্যু যেন পুরো পরিবারকে থমকে দিয়েছে।

আবেগজড়িত কণ্ঠে ড. নাহিদা বেগম বলেন, “ও-ই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। ওর হাসি, ওর কথা, ওর ছোট ছোট আবদারেই আমাদের ঘরটা ভরে থাকত। আজ সেই ঘরেই ও নেই। ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই। আমরা কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেব, জানি না।”

অপ্রতিমের বাবা শাহরিয়ার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থাও একই। ঘরের প্রতিটি কোণে সন্তানের স্মৃতি, অথচ সেই স্মৃতির মানুষটিই নেই।

বৃহস্পতিবারও ছিল হাসি-আড্ডা, শুক্রবারই নিখোঁজ 

অপ্রতিমের বন্ধুদের কাছে বৃহস্পতিবারের দিনটিও এখন কেবল স্মৃতি। এক বন্ধুর সঙ্গে সেদিনও ফুটবল খেলেছিল অপ্রতিম। গোলকিপার হিসেবে বন্ধুর খেলা দেখে জন্মদিনে তাকে গোলকিপিংয়ের গ্লাভস উপহার দেওয়ার কথা বলেছিল সে।

অপ্রতিমের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু বলেন, “বৃহস্পতিবার আমরা সবাই ফুটবল খেলছিলাম। আমি গোলকিপার ছিলাম। অপ্রতিম বলেছিল, আমার জন্মদিনে আমাকে গোলকিপারের গ্লাভস গিফট করবে। পরদিন শুক্রবার সকালে আমরা জানতে পারি, ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবারও যে ছেলেটা আমাদের সঙ্গে খেলেছে, পরদিন তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না-এটা এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।”

এরপর অপ্রতিমের নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও বন্ধুরা তাকে খুঁজতে থাকেন। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু পরদিন দুপুরে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে।

বন্ধুর ভাষায়, “আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করছি, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ভরসা করার জায়গা খুব কম। আমার ভাই নিখোঁজ ছিল, পুলিশকে জানানো হলেও তাকে খুঁজে বের করা যায়নি। পরদিন দুপুরে তার লাশ পাওয়া গেছে। আমরা চাই, আমার ভাইয়ের খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করা হোক।”

‘খুব সহজ-সরল ছিল অপ্রতিম’

বন্ধুদের কাছে অপ্রতিম শুধু একজন সহপাঠী বা খেলার সঙ্গী ছিল না; ছিল হাসি-আড্ডার একজন আপনজন। তার স্বভাবের কথা বলতে গিয়ে এক বন্ধু বলেন, “খুবই ভালো মানুষ ছিল অপ্রতিম। তার মধ্যে কখনো হিংসা-বিদ্বেষ দেখিনি। সে কখনো কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলত না। খুবই সহজ-সরল একজন মানুষ ছিল। তার এমন নির্মম মৃত্যু আমরা কখনো আশা করিনি।”

আরেক বন্ধু বলেন, “অপ্রতিম সবসময় হাসিখুশি ছিল। সবার সঙ্গে মিশত। ওর নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। পরে যখন ওর মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনি, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কিছুতেই মানতে পারছি না, ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।”

বন্ধুরা চান দৃষ্টান্তমূলক বিচার

রোববার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ও বিচারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। সেই মিছিলেও অপ্রতিমের বন্ধুরা তার হত্যার বিচার দাবি করেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক বন্ধু বলেন, “যারা অপ্রতিমকে হত্যা করেছে, আমরা তাদের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি চাই। আমরা চাই, প্রশাসন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনুক এবং অপ্রতিম যেন উপযুক্ত বিচার পায়।”

আরেক বন্ধু বলেন, “যে মানুষটি অপ্রতিমের সঙ্গে এমন নির্মম আচরণ করেছে, আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি-অপ্রতিমের হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা হোক।”

বন্ধুদের এসব কথার মধ্যেও বারবার ফিরে আসে সেই বৃহস্পতিবারের ফুটবল মাঠ। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে কিশোর বন্ধুর জন্মদিনে গ্লাভস উপহার দেওয়ার কথা বলছিল, সেই বন্ধুর হাতেই এখন তার ছবির স্মৃতি। একটি ফুটবল, একটি গ্লাভস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আর কয়েকটি হাসিমুখের স্মৃতি-এসবই এখন অপ্রতিমকে ফিরে পাওয়ার একমাত্র অবলম্বন তার বন্ধুদের কাছে।

থেমে গেছে পরিবারের স্বপ্ন

অপ্রতিম ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাই তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তার পড়াশোনা, পছন্দের বই, স্কুল, বন্ধু-সবকিছু ঘিরেই ছিল মা-বাবার পরিকল্পনা।

সেই স্বপ্নগুলো এখন পড়ে আছে অপ্রতিমের ঘরের বইয়ের তাকে, তার ছবির ফ্রেমে আর দরজার বাইরে ঝোলানো কাঠের নামফলকে।

বাইরে থেকে ‘অপ্রতিমদের বাসা’ লেখা নামফলকটি এখনো আগের মতোই আছে। শুধু নামফলকের ছবির সেই হাস্যোজ্জ্বল বালকটি আর কোনোদিন দরজা খুলে ঘরে ফিরবে না।

উল্লেখ্য, শুক্রবার দুপুরের পর বাসা থেকে আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে বিনোদন পার্ক ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’ সংলগ্ন দক্ষিণ সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি