খাদ্যনিরাপত্তায় টেকসই আমন উৎপাদন

বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা ধান আবাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এটি আমাদের খাদ্যব্যবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষকের জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কোনো একটি মৌসুমে যদি ধানের উৎপাদন ব্যবস্থায় সমস্যার সৃষ্টি হয় এটি তখন শুধু কৃষি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তা প্রভাব বিস্তার করে। আমাদের দেশে সাধারণত খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় নিয়ে কথা উঠলে আমরা বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন নিয়ে আলোচনা করি। বোরো আবাদ ঠিক থাকলে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। তবে আমন মৌসুম আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। একটি সফল আমন মৌসুম শুধু ধানের উৎপাদনই বাড়ায় না; এটি ধানের সরবরাহ ব্যবস্থা, সরকারি মজুত, বাজার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। 

একটু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ টন পরিমাণ আমন ধানের উৎপাদন হয়েছে। এই সময়ে আমনের চাষ হয়েছে ৫৭ দশমিক ৩৬ লাখ হেক্টর জমিতে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। এ সময় উচ্চফলনশীল জাতের ধানের আবাদ ৩ শতাংশ বেড়ে ৪৬ দশমিক ৫০ লাখ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ আমন মৌসুম থেকে আসে। 

সম্ভাবনার আমন আবাদ
আমন মৌসুমে ধান আবাদের কিছু সুবিধা আছে। আউশ কিংবা বোরো মৌসুমের তুলনায় আমন মৌসুমে ধান আবাদের একটি বড় সুবিধা হলো এটি প্রায় সারা দেশে আবাদ করা যায়। আমন আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যেহেতু প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে আমনের আবাদ হয়ে থাকে সেহেতু কোনো একটি জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত করলেও জাতীয় ফলনে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। অন্য এলাকায় ভালো ফলন স্থানীয় এ ধরনের ক্ষতিকে পুষিয়ে ওঠার উপায় করে দেয়। 

আমাদের দেশের প্রায় অধিকাংশ শস্যবিন্যাস আমন ধানকেন্দ্রিক। বর্তমানে আমনের যে জাতগুলো মাঠপর্যায়ে ইতিবাচক ফলাফল দিচ্ছে সেগুলোর মধ্যে স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাতগুলো সঠিক সময়ে রোপণ করা গেলে পরবর্তী বোরো মৌসুমের আগেই একটি ডাল/তেল ফসল শস্যবিন্যাসে যুক্ত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি আগামী শীতকালীন সবজি আবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এভাবে তেলজাতীয় ফসল আবাদের মাধ্যমে আমরা ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারব। আবার শস্যবিন্যাসে দুটি ধানের মধ্যবর্তী সময়ে ডাল/তেল ফসল অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখা ও শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। 

আমনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো- এটি বৃষ্টিনির্ভর একটি ফসল। বর্ষার প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাত আমন আবাদের পানির বড় চাহিদা মিটিয়ে থাকে। বোরো ধানের মতো কৃত্রিম সেচের প্রয়োজন হয় না। এতে একদিকে যেমন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর কম চাপ পড়ে অপরদিকে তেলের পেছনে খরচ হয় না বিধায় কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়। 

আমন মৌসুমে কিছু ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। জলবায়ুজনিত এই ঝুঁকিগুলোকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
১. অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা আকস্মিক বন্যা আমন মৌসুমের অন্যতম প্রধান সমস্যা। ভারী বৃষ্টিপাত আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাই এবং সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে এ ধরনের বন্যার পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবসময় এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমন ধানের রোপণ দেরি হয়। এর প্রভাব পরবর্তী রবি মৌসুমেও পড়ে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার কারণে ক্ষতির মাত্রা দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ ধান উৎপাদিত হয় এ অঞ্চলে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্ষার আগে এবং বর্ষার সময়ে বৃষ্টিপাত বাড়বে। এটি পরবর্তীকালে বন্যার পরিমাণও বাড়িয়ে দেবে। 

২. বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও দীর্ঘ সময় ধরে মেঘলা আবহাওয়া আমন ফলন ও বৃদ্ধির পথে নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বাতাসে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্পের কারণে ধানের পাতা ও খোল স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় থাকে। এটি বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ যেমন- খোল পোড়া, ব্লাস্ট, বাদামি দাগ রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি মেঘলা ও গরম আবহাওয়া বাদামি গাছ ফড়িং বা কারেন্ট পোকা, পাতা মোড়ানো পোকার মতো ক্ষতিকর পোকার প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে দেয়। 

৩. শারীরবৃত্তীয় কিছু সমস্যাও আমন মৌসুমে ধানের ফলনে প্রভাব বিস্তার করে। সূর্যের আলো সঠিকভাবে না পেলে সালোক সংশ্লেষণের হার কমে যায়। ফলে গাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য তৈরি করতে পারে না। এতে করে ধান গাছ দুর্বল হয়ে যায়। অপরদিকে ধানের ফুল ফোটার সময় বাতাসে বেশি পরিমাণে আর্দ্রতা থাকলে কিংবা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে ধানের পরাগরেণু ঝরে যায়। এতে ধান গাছে চিটা হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আমাদের কৃষি ও কৃষকের জন্য অন্যতম এক চ্যালেঞ্জ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৃষির উৎপাদন ধরে রাখতে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে। ধানকেন্দ্রিক আমাদের এই উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষকদের সাহায্য করতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আমন মৌসুমে ধানের বেশ কিছু জাত উদ্ভাবন করেছে। নিচু এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী এসব জাত আকস্মিক বন্যা বা জলমগ্নতা সহনশীল। ১০ থেকে ১৫ দিন পানির নিচে সম্পূর্ণ ডুবে থাকলেও এ জাতের গাছ নষ্ট হয় না কিংবা মারা যায় না। বরং পানি নেমে গেলে নতুন করে কুশি বের হতে শুরু করে। ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২— মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয় আমন মৌসুমের দুটি জাত। যেসব এলাকায় হঠাৎ বন্যা হয় এবং পানি জমে থাকে সেসব এলাকার কৃষকদের কাছে এ দুটি জাত খুবই জনপ্রিয়। এ ধরনের আরেকটি জাত হলো ব্রি ধান১১০। যদিও এ জাতটি এখনও সেভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি। তবে নতুন জাত হিসেবে এটির প্রসারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। প্রিমিয়াম বা সুগন্ধি চালের বাজারের জন্য ব্রি ধান৩৪ কৃষকের মাঝে জনপ্রিয়। অপরদিকে উপকূলীয় এলাকা যেখানে জোয়ার-ভাটার বিষয় জড়িত আছে সেসব জায়গার জন্য ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ উপকূলীয় এলাকার কৃষকের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। ব্রি ধান৮৭ আমন মৌসুমের ক্ষেত্রে একটি মেগা ভ্যারাইটি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন এই জাতটি আমন মৌসুমের অন্যান্য জাতের তুলনায় আগাম কাটা যায় বিধায় আগাম শীতকালীন সবজিসহ রবিশস্য আবাদ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। 

টেকসই আমনকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিতে করণীয়

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত এবং প্রযুক্তি দ্রুততার সঙ্গে কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সম্প্রসারণ ও কৃষক— এ তিনের মাঝে আন্তঃসংযোগ সমন্বিত হতে হবে। বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য আলাদা করে বীজের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজনে চারার বিকল্প জোগান প্রস্তুত রাখতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত অবস্থায় কৃষকের হাতের নাগালে যেন বীজ, চারা, সার ইত্যাদি উপকরণ থাকে সেদিকে সব পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সজাগ থাকতে হবে। ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষিঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। রবিশস্য উৎপাদনে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও আমন মৌসুমে এ ধরনের ব্যবস্থার কিছুটা ঘাটতি থাকে। ব্যাংকগুলোকে সহজ ও স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা এবং দুর্যোগে যদি ফসলের ক্ষতি হয় তাহলে কিস্তি পরিশোধে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আমন মৌসুমে দুর্যোগের যেহেতু সম্ভাবনা থাকে সেক্ষেত্রে উঁচু জায়গায় বীজতলা তৈরিতে কৃষকদের পরামর্শ দিতে হবে। বীজতলা রক্ষা করার কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ট্রেতে বীজতলা তৈরি করতে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। এতে একদিকে যেমন বীজতলা রক্ষা পাবে অপরদিকে যান্ত্রিকীকরণের পথ সুগম হবে। এক্ষেত্রে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

এর সঙ্গে রাসায়নিক সার প্রয়োগে সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। বৃষ্টিপাতে সারের অপচয় হয়। সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ কৃষকের উৎপাদন খরচকে কমিয়ে দেয়। রাসায়নিক সার কয়েক কিস্তি করে জমিতে প্রয়োগে কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ক্ষেত্রে ক্রপ ক্যালেন্ডার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। পরিবর্তিত আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে স্থানীয় উপযোগিতা মাথায় রেখে স্থানীয় অঞ্চলভিত্তিক ক্রপ ক্যালেন্ডার করতে হবে। প্রয়োজনে পুরোনো বিন্যাসকে পরিবর্তন করে নতুন বিন্যাস তৈরি করতে হবে এবং কৃষককে নতুন বিন্যাসে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। 

একটি টেকসই আমন উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে সফলতা আসবে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সম্প্রসারণ কর্মী, টেকসই উপকরণ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান— সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমন উৎপাদন ব্যবস্থাকে কৃষকের একার বিষয়ে না রেখে সঠিক নীতি, পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে কাজের মাধ্যমে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আমরা যদি তা করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে আমন মৌসুমের ধান আমাদের ধানকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন এক মাত্রা যোগ করবে। 

মো. হাসান ইমাম
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা
লক্ষ্মীপুর সদর, লক্ষ্মীপুর

[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]