মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের ইটা বড়বাড়ি গ্রাম। ৮০-৮৫টি পরিবারের এই গ্রামে কৃষিই প্রধান পেশা। এরই মাঝে টিনের একটি বসতঘরের এক পাশে ছোট্ট দোকান। দোকানটি অর্পনা রানী সরকারের (৪০)।
চার বছর আগে স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে দুটি গরু বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছিলেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় অন্ধকার নেমে এসেছিল জীবনে। সেই অন্ধকার থেকে ২০ হাজার টাকার এনজিও ঋণ নিয়ে নিজেই আলো জ্বেলেছেন। এখন তার দোকানের আয়েই চলছে সংসার, চলছে দুই মেয়ের পড়াশোনা।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অর্পনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ঘরের একটি অংশজুড়ে তার ব্যবসা। দেয়ালে দড়ি দিয়ে ঝুলছে চানাচুর, চিপস, বিস্কুট। পাশে সারি করে রাখা লবণ, মরিচ, তেল, সাবানের প্যাকেট। বসার চেয়ার-টেবিল নেই। ক্রেতা এলে দাঁড়িয়েই পণ্য দেন তিনি।
ইউটিউব দেখে হলুদ তরমুজ চাষ, ৩ মাসে আয় ৫ লাখ
গ্রামের মানুষই তার ক্রেতা। কেউ চাল-ডাল বাকিতে নেন, মাস শেষে শোধ করেন।
অর্পনার স্বামী জিতেন্দ্র সরকার পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তার আয়েই চলত ৪ জনের সংসার। হঠাৎ জিতেন্দ্রর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচার লাগে।
অর্পনা বলেন, ‘চিকিৎসার খরচ জোগাইতে বাড়ির দুইটা গরু বেঁচি দিলাম। সঞ্চয়ের সব টাকাও শেষ। অপারেশনের পরে ডাক্তার কইলা ভারী কাম করা যাইতো নায়। তখন সংসার কেমনে চলব, বাইচ্চাইনতোরে (মেয়েদের) লেখাপড়া কেমনে করাইমু - এই চিন্তাত ঘুম আওয়া বন্ধ অই গেছিল।’
২০ হাজার টাকার ঋণেই নতুন শুরু
হতাশা থেকে বের হতে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন অর্পনা। ঘরের এক কোণায় তুলেন ছোট দোকান।
মৌলভীবাজারে অনাবাদি জমিতে ড্রাগনের বাম্পার ফলন
শুরুটা সহজ ছিল না। অর্পনার ভাষায়, প্রথম ছয়-সাত মাস লস খাইছি। বুঝতাম না কেমনে কি করতাম। আস্তে আস্তে সব শিখছি। এখন হিসাবও করতাম পারি। আগে তো থ্রি পর্যন্ত পড়ছি।
শুরুতে শুধু লবণ-মরিচ রাখতেন। পরে স্বামীর মাধ্যমে শহর থেকে পণ্য আনিয়েছেন। এখন প্রতি বৃহস্পতিবার কোম্পানির লোকজন ভ্যানে করে মাল দিয়ে যান।
দোকানই এখন সংসারের চাকা
পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন অর্পনা। বর্তমানে দোকান থেকে প্রতি মাসে ৫-৬ হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়েই সংসার চলে। ঋণের কিস্তিও শোধ করেছেন।
সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মেয়েদের পড়াশোনা। তার বড় মেয়ে এবার এসএসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে পড়ে নবম শ্রেণিতে। স্বামী জিতেন্দ্রও এখন আগের চেয়ে সুস্থ। কিছু কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করেন।
সত্যজিৎ রায়ের বাড়ির পেছনের নদীতে রক্তিম রহস্য!
গ্রামের মানুষের আস্থা
ইটা বড়বাড়ি গ্রামের মানুষের এখন ভরসার জায়গা অর্পনার দোকান। হাওর থেকে দূরে হওয়ায় বাজারে যেতে কষ্ট। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছু এখান থেকেই কেনেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মালতি রানী বলেন, অর্পনা দিদির দোকান না থাকলে আমাদের ৩ কিলোমিটার হেঁটে বাজারে যাওয়া লাগত। সে বাকিও দেয়, বিপদে সাহায্যও করে।
স্বপ্ন বড় দোকানের
অর্পনার এখন নতুন স্বপ্ন। তিনি বলেন, ইচ্ছা আছে দোকানটা আরও বড় করার। কিন্তু আর ঋণ নিতাম চাই না। যদি কোনো সহযোগিতা পাই, তাইলে গ্রামের সড়কের পাশে দোকানটা নিয়া যাইতাম। তাইলে আরও মানুষ আইত।
অর্পনা রানী সরকারের গল্প শুধু একটি দোকানের গল্প নয়। এটি হেরে না যাওয়ার গল্প। স্বামীর অসুস্থতা, পুঁজির অভাব, সমাজের চোখ সব প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।
বালু ভরাটে বন্ধ পানি নিষ্কাশনের পথ, পানিবন্দী ২০০ পরিবার
২০ হাজার টাকার একটি ঋণ আর অদম্য মনোবল কীভাবে একটি পরিবারের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে, অর্পনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। হাওরপারের এই নারী উদ্যোক্তা এখন গ্রামের অন্য নারীদেরও অনুপ্রেরণা।
—জা. অর্থনীতি/এনজে