বাইশ গজ থেকে বঙ্গভবন: ঠাকুরগাঁওয়ে ক্রিকেটের অনন্য রূপকার
ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিবেদক: ​একটি কাঠের ব্যাট, চামড়ার লাল বল আর সবুজ ঘাসের ওপর বাইশ গজের টানটান উত্তেজনা—যেখানে মিশে থাকে শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর নান্দনিক স্পোর্টসম্যানশিপ। ক্রিকেটের এই সৌন্দর্যকে যিনি জীবনের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, উত্তরের প্রত্যন্ত জনপদে যিনি বুনেছিলেন ক্রিকেট সংস্কৃতির আদি বীজ, তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে অবিচল কাণ্ডারি হয়ে আজ তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ অলঙ্কৃত করেছেন। কিন্তু তার মূল সত্তায় তিনি চিরকাল এক বিশুদ্ধ ক্রিকেটপ্রেমী, দক্ষ সংগঠক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী প্রতিষ্ঠান।

​১৯৮৪ সালের কথা। ঠাকুরগাঁও তখন সবেমাত্র নতুন জেলার মর্যাদা পেয়েছে। সেই রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে একদল স্বপ্নবাজ তরুণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন তার সহযোদ্ধারা—মো. বারেকাল্লা, আব্দুল গোফরান, নবগোপাল সামন্ত, আনিসুর রহমান, মির্জা বাবলু, ওয়াসেল পাশা ও লুৎফর রহমানদের মতো নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়ানুরাগীরা।

এক মামলায় ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ, ২২ বছর পর মিথ্যা প্রমাণিত

তাদের মধ্যে আমার বাবা মো. বারেকাল্লা ছিলেন এমন এক ক্রিকেটপাগল মানুষ, যার ভালোবাসার সীমানা ছিল ব্যাকরণহীন। ক্রিকেটের নিখাদ টানে ১৯৭৯ সালে কোনো ধরনের পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতীয় বোর্ডারে ২০০ টাকা দিয়ে তিনি স্রেফ রোমাঞ্চ নিয়ে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ দেখতে কলকাতা ছুটে গিয়েছিলেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমার বাবার হাত ধরেই ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম তৈরি হয়েছিল আধুনিক ক্রিকেট পিচ। ম্যাচ থাকলেই স্থানীয় বিখ্যাত ‘গৌসিয়া হোটেল’-এর লাঞ্চ ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত ও আনন্দময় উপহার।

সেই যৌথ স্বপ্নের জমিনে ফখরুল স্যারের দূরদর্শী নেতৃত্বে ১৯৮৬ সালে উইলস কাপ ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের ভেন্যু হয় ঠাকুরগাঁও। প্রথমবারের মতো সীমান্তঘেঁষা এই শান্ত শহরে রচিত হয় আধুনিক ক্রিকেট সংস্কৃতির মজবুত ভিত্তি। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক ক্রিকেট লিগ।

​সে বছরটি আমার জীবনের জন্যও হয়ে রইল এক অমূল্য স্মৃতির দলিল। আমার বাবার অনুরোধে ফখরুল স্যার নিজ দায়িত্বে ঢাকা থেকে আমার জন্য নিয়ে এসেছিলেন একটি ‘ইহসান’ ব্র্যান্ডের ব্যাট। লাল বলের ক্রিকেটে সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম ব্যাট যার প্রতিটি স্পর্শে আজও আমি খুঁজে পাই একজন পরম অভিভাবকের স্নেহাশিস ও অনুপ্রেরণা।

ম্যাচ-সিরিজ জেতার পর বোনাস পাবেন না ক্রিকেটাররা, বিকল্প ভাবছে বিসিবি!

​১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেই সোনালী সময়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অবহেলিত জনপদে ক্রিকেটের অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। তার হাত ধরেই ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠে খেলতে এসেছিল ঢাকার শীর্ষ ক্লাব আবাহনী, মোহামেডান এবং দূর শ্রীলঙ্কার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররা। উত্তরের প্রান্তিক জনপদ তখন রোমাঞ্চিত হয়ে প্রত্যক্ষ করেছিল বিশ্বমানের ক্রিকেটীয় দ্বৈরথ।

​ক্রিকেট মাঠে যে ঐতিহ্য আর দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা আজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। তারই অনুজ মির্জা ফয়সাল আমিন বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হিসেবে বড় ভাইয়ের সেই পথ অনুসরণ করে উত্তরের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার ব্রত পালন করে যাচ্ছেন।

​বাইশ গজের সেই ধৈর্য, সংযম আর নিখুঁত কৌশল আজ প্রতিফলিত তার রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞায়। ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠ থেকে উঠে এসে তিনি আজ দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে আসীন। জীবনের প্রতিটি ক্রিজে তিনি প্রমাণ করেছেন—পরাজয়ে ভেঙে না পড়া এবং বিজয়ে অহংকারী না হওয়াই প্রকৃত স্পোর্টসম্যানশিপ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেবল কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি তৃণমূলের ঘামঝরা পিচ থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার এক অনুপম, চিরন্তন প্রতিষ্ঠান।

লেখক: মো. রাশেদ ইকবাল