অস্তিত্ব সংকটে বিশ্বজুড়ে মুসলিম সংখ্যালঘুদের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ঘুমিয়ে পড়ে পরদিন সকালে যদি জানেন—আপনার সব অধিকার কেড় নিয়ে আপনাকে ঘোষণা করা হয়েছে ‘অবাঞ্ছিত বহিরাগত’? কাল্পনিক মনে হলেও, আজ বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম সংখ্যালঘুর জীবনের চরম ও নির্মম বাস্তবতা এটাই। কেবল শারীরিক উচ্ছেদ নয়; জনসংখ্যা গণনায় নীরব কারচুপি, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং ইতিহাস থেকে পরিচয় মুছে ফেলার মতো এক সূক্ষ্ম ছক বোনা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া এই ভয়াবহ বাস্তবতার অন্যতম বড় উদাহরণ। কৌশলগত অবহেলা ও বৈষম্যমূলক রাজনীতির কারণে আজ বিশ্বের বহু প্রান্তে মুসলিম সংখ্যালঘুরা নিজস্ব পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াইয়ে লিপ্ত।

আন্তর্জাতিক স্তরে মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো-

জনসংখ্যা গণনায় কারচুপি: নির্দিষ্ট কিছু ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিকল্পিতভাবে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত বাস্তবতার চেয়ে কম দেখায়। এর ফলে সমাজে মুসলিমদের রাজনৈতিক ও জনমিতিক প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি ওআইসি-ভুক্ত নাইজেরিয়া ও বিপুল সংখ্যক মুসলিমের দেশ ভারতে প্রকৃত জনসংখ্যার চেয়ে পরিসংখ্যানে কম দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যহীনতার ঝুঁকি ও বৈষম্য: বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ তথ্যের অভাবে মুসলিমদের প্রকৃত সামাজিক অবস্থা আড়ালে থেকে যায়। বিশ্বমানের তথ্য ও সার্চ ইঞ্জিন প্ল্যাটফর্মে অনুপাত কমিয়ে উপস্থাপন করায় তাদের সমতা ও মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত আলোচনা সংকুচিত হয়ে পড়ে।

জনমিতিক কাঠামো বিচ্ছিন্নকরণ: মুসলিম ঘনবসতিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ভেঙে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অতীতে সোভিয়েত আমলে ব্যবহৃত এই কৌশল বর্তমানেও বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়, যেখানে ঐক্যবদ্ধ জনপদ ভেঙে অমুসলিম অঞ্চলের সাথে মিশিয়ে দিয়ে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস করা হয়।

নাগরিকত্ব হরণ ও উচ্ছেদ: রোহিঙ্গাদের মতো আইনি অধিকার কেড়ে নিয়ে মুসলিমদের অবাঞ্ছিত বহিরাগত বানানোর অজুহাত তৈরি করা হয়, যাতে যেকোনো সময় তাদের নিজ ভূমি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়।

মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিতকরণ: শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত রেখে মুসলিমদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ—যেমন উচ্চতর বেসামরিক প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

ইসলামবিদ্বেষী নীতি ও শাসকগোষ্ঠী: অনেক ক্ষেত্রে এমন শাসনব্যবস্থা ও নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা সরাসরি ইসলামের মূল আদর্শ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। এর ফলে মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তাধারার মানুষদের উপর নানা বিধিনিষেধ নেমে আসে।

মুসলিম সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন সঠিক তথ্য ও প্রকৃত পরিসংখ্যান তুলে ধরা। বিশ্বমঞ্চে এই জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও সঠিক অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত করতে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি ওআইসি (OIC) এবং মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 জা. অর্থনীতি/ ওএফএ