নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে ১,২০৩ কোটি টাকার প্রকল্প

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকট ও স্যানিটেশন সমস্যার সমাধানে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। এর আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৯ হাজার ৭৭৮টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ এবং নিরাপদ পানি সরবরাহে প্রায় ২৭ হাজার নলকূপ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে থাকা এ অঞ্চলে আরও নলকূপ বসানোর যৌক্তিকতা ও প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একজন বিশেষজ্ঞ।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ শীর্ষক প্রকল্পটি আগামী ২৫ অক্টোবর সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন প্রকল্পটির পুরো ব্যয় বহন করবে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার ১২৩টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্পটির লক্ষ্য। পানিসংকট ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনের কারণে পানিবাহিত রোগ, পরিবেশদূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতায়ও।

যা থাকছে প্রকল্পে
প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র মানুষের জন্য দুই পিটবিশিষ্ট ৫৯ হাজার ৭৭৮টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্থাপন করা হবে কমিউনিটিভিত্তিক ৪ হাজার ৩৯৪টি পানি সরবরাহ ইউনিট। প্রস্তাবিত নলকূপের মধ্যে অগভীর নলকূপ ২২ হাজার ১৭৬টি এবং গভীর নলকূপ ৪ হাজার ৮২৯টি। এই দুই ধরনের নলকূপের মোট সংখ্যা ২৭ হাজার ৫টি। পাশাপাশি সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ ৫ হাজার ৩৯৯টি অগভীর এবং ১ হাজার ১১৩টি গভীর নলকূপ স্থাপনের কথাও রয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে।

অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১২৫টি গণশৌচাগার, ১ হাজার ৬৮টি রিংওয়েল এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ১ হাজার ৭৯৭টি ব্যবস্থা নির্মাণ। এছাড়া পুকুর পুনর্খননসহ ১৬টি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) নির্মাণ করা হবে।

ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তি চাপের শঙ্কা
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকায় মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ঘাটতি এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকটকে আরও জটিল করছে। ধান চাষে সেচের চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভ থেকে পানি তোলা হয়। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিন ধরে পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর নিচে নামছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ পরিস্থিতিতে নতুন প্রকল্পে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূজলবিদ্যা নিয়ে প্রায় চার দশক ধরে গবেষণা করছেন তিনি।

জাতীয় অর্থনীতিকে চৌধুরী সারোয়ার জাহান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে তদারকি ও নিয়মনীতি প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। অগভীর ও গভীর নলকূপের পানি দিয়ে মাছ চাষও করা হচ্ছে। বিকল্প পানির উৎস গড়ে না তুলে শুধু ভূগর্ভ থেকে পানি তোলার ওপর নির্ভরশীলতা বজায় রাখলে নতুন প্রকল্পটিও ভবিষ্যতে ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।


তার ভাষ্য, গভীর নলকূপ দিয়ে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে এ অঞ্চলে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাচ্ছে। অথচ পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত এলাকাতেও নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রস্তাব ও প্রক্রিয়া চলছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে মন্তব্য করেন এই গবেষক।


সংকট উত্তরণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন চৌধুরী সারোয়ার জাহান। তার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।

তিনি বলেন, পানির উৎস ও তার স্থায়িত্ব বিবেচনা না করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে এমন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়।