জ্বালানির চাপে বাড়ছে ডলারের দর

সাইদুর রহমান নোমান, ঢাকা: দেশে আবারও ডলারের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সময়ে কয়েক মাস ধরে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকা রেমিট্যান্স জুনে কমে আসা, ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ— সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন করে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর ডলার কেনার দাম প্রায় এক টাকা বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮০ থেকে ৯০ পয়সা দরে কিনেছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌখিকভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার কাছাকাছি। তবে কিছু ব্যাংক ১২৩ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার কিনেছে বলে একাধিক ট্রেজারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ব্যাংকগুলো গড়ে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৪৫ পয়সা দরে কিনেছিল। জুনের শুরুতে সেই দাম বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকায় ওঠে। জুনের মাঝামাঝি তা ১২৩ টাকা ৪০ থেকে ৫০ পয়সায় পৌঁছায়। বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক ১২৩ টাকা ৯০ থেকে ৯৫ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার কিনছে।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, বাজারে খুব বেশি আতঙ্ক না থাকলেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে সেটিই দাম বাড়ার মূল কারণ। বিশেষ করে সরকারি জ্বালানি আমদানির জন্য বড় অঙ্কের ডলার একসঙ্গে বাজার থেকে কিনতে হওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের বড় অংশের জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কখনও ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমেছে আবার যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হলে ৯০ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং সার আমদানির জন্য আগে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতো। গত কয়েক মাসে আমদানির পরিমাণ খুব বেশি না বাড়লেও ব্যয় প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি ডলারের বাজারে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি ব্যয় ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত (ক্রুড) পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ৫৮৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে বেড়ে ১ দশমিক ১৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ক্রুড পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে পেট্রোলিয়াম অয়েল অ্যান্ড লুব্রিক্যান্টস আমদানিতে ব্যয় বেড়ে ৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং আমদানির পরিমাণ বাড়ায় এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে কারণে ডলারের দামও চড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যও সেই চিত্রই তুলে ধরছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেড়ে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অথচ একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, মূলধনি যন্ত্রপাতি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ, ভোগ্যপণ্য প্রায় ৭ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। ব্যতিক্রম শুধু জ্বালানি খাত। অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি নিষ্পত্তি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ দেশের সামগ্রিক আমদানি স্থবির থাকলেও জ্বালানির জন্য ডলারের চাহিদা বেড়েছে।

ডলারের বাজারে চাপ বাড়ার আরেকটি কারণ রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিছুটা কমে যাওয়া। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত টানা ছয় মাস দেশে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। তবে জুন মাসে তা কমে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। জুলাই মাসেও প্রবাহ প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। যদিও বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনও ৩১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি যা দিয়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি বিল পরিশোধ করা সম্ভব। তবে ডলারের ওপর চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে রিজার্ভ ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিলাসপণ্য আমদানিতে কঠোরতার সঙ্গে সরকারি ব্যয়েও কৃচ্ছ্রসাধন প্রয়োজন হবে। বাজারে বেশি অস্থিরতা দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সীমিত পরিসরে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হতে পারে। তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

ডলারের বাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে গেল আইএমএফ প্রতিনিধিদল। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ পেতে হলে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ সীমিত করার শর্ত মানতে হতে পারে। আগের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের অন্যতম প্রধান শর্তও ছিল বাজারভিত্তিক বিনিময় হার।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ডলারের বাজার সামাল দিতে বিভিন্ন দেশ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। ভারতে রুপির ওপর চাপ বাড়লে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বাজারে বিক্রি করে। তবে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড় হওয়ায় একই ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশে নেওয়া কঠিন। অন্যদিকে মিসর ও পাকিস্তান বাজারভিত্তিক বিনিময় হার গ্রহণ করে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হতে দিয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ভারসাম্য ফিরতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রিজার্ভ সীমিত। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে ডলার বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং বর্তমান রিজার্ভ ধরে রাখাই উচিত।  জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডলারের ওপর চাপ বাড়লে বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত অবমূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। 

এছাড়া প্রয়োজনে নীতি সুদহার বৃদ্ধির কথাও ভাবা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। যদিও গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়েছে। সাবেক গভর্নরের মতে, ডলারের সংকট মোকাবিলায় আমদানিতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপের প্রয়োজন নেই। বরং উচ্চ হারে কর আদায়ের মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দিলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারের ডলার দরের পার্থক্য কমিয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার ওপর তিনি জোর দেন।